দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বিশেষ করে গত রমজানকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বাড়ছে। এ অবস্থায় তারা আশঙ্কা করছেন, ধারাবাহিক এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট—বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১,৩৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৪৪ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ১,১৭৫ কোটি ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে ৩,৯৮৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের এই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৩,৮০০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, একই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ কম। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানেই চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে।
দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২১.৮ শতাংশ বেড়ে ১,৯৪৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে এফডিআই ৮০ কোটি থেকে বেড়ে ৮৬ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ায় সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত অবস্থা বজায় রয়েছে।
চলতি হিসাবের সামান্য ঘাটতি, সামগ্রিক লেনদেনে স্বস্তি:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলতি হিসাবের সামান্য ঋণাত্মক অবস্থার মধ্যে সামগ্রিক লেনদেন ভালো অবস্থায় রয়েছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য মূলত দেশের নিয়মিত লেনদেনে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। উদ্বৃত্ত থাকলে দেশকে ঋণ নিতে হয় না। সাধারণভাবে, উন্নয়নশীল দেশের জন্য চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জানুয়ারি মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ডলার। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ে ১৩২ কোটি ডলারের ঘাটতির তুলনায় অনেক কম। সামগ্রিক লেনদেনের (ওভারঅল ব্যালান্স) দিক থেকে দেশ ভালো অবস্থায় আছে। আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের উদ্বৃত্ত হয়েছে ২৮৩ কোটি ডলার। আগের বছর একই সময়ে এই সূচক ১২২ কোটি ডলারের ঘাটতিতে (ঋণাত্মক) ছিল।
তবে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। আলোচিত সময়ে বাজার থেকে প্রায় ১২ কোটি ডলার চলে গেছে। এছাড়া চলতি হিসাবের সামান্য ঋণাত্মক অবস্থার কারণে উন্নয়নশীল অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রবাসীরা ১,৯৪৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছর একই সময়ে রেমিট্যান্স ছিল ১,৫৯৬ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ২১.৮ শতাংশ। প্রবাসীদের এই প্রেরিত অর্থ এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সামগ্রিক লেনদেনকে উদ্বৃত্ত অবস্থায় রাখছে।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে:
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এফডিআই প্রবাহ ছিল ৮০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৮৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দেশে সরাসরি বিনিয়োগে ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করছে।
তবে, সামগ্রিক লেনদেনে স্বস্তি থাকলেও দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট নেতিবাচক অবস্থায় নেমেছে। আলোচিত সময়ে শেয়ারবাজার থেকে ১২ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ চলে গেছে। এর আগের অর্থবছরে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ঋণাত্মক ছয় কোটি ডলার।
এফডিআইয়ের বৃদ্ধি দেশীয় উৎপাদন ও শিল্পখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও পোর্টফোলিও প্রবাহে নেতিবাচক অবস্থার কারণে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

