মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর এক মাস পেরিয়েছে। এই সময়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও আমদানি কার্যক্রম থেমে নেই। বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিকল্প উৎস খুঁজে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে দেশে ১১টি জাহাজে করে মোট ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল, ২২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল রয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সব জাহাজ পৌঁছাতে পারেনি। এই সময়ে অন্তত আটটি জাহাজ বন্দরে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন জ্বালানি আসার কথা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম জাহাজটি দেশে পৌঁছায় ৩ মার্চ। ‘এমটি ওরিয়েন্টাল গ্রিনস্টোন’ নামের ওই জাহাজে ছিল ৩২ হাজার টন ডিজেল, যা সরবরাহ করে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। সর্বশেষ জাহাজটি আসে শুক্রবার দুপুরে। ‘এমটি ইউয়ান জিং হে’ নামের ওই জাহাজে সিঙ্গাপুর থেকে আনা হয় ২৭ হাজার টন ডিজেল।
এদিকে সরবরাহে অনিশ্চয়তার খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ভিড় ও দীর্ঘ লাইনের চিত্র দেখা গেছে। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। নির্ধারিত জাহাজগুলোর মধ্যে কয়েকটির অগ্রগতি হয়েছে। একটি ইতিমধ্যে পৌঁছেছে এবং আরও তিনটি আসার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের বাইরে নতুন উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জুন পর্যন্ত একটি প্রাথমিক আমদানি পরিকল্পনা তৈরি করেছে বিপিসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মে মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল, ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস তেল আনার পরিকল্পনা রয়েছে। জুনে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস তেল।
তবে এই পরিকল্পনা স্থির নয়। আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। বিপিসি বলছে, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে মজুত পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে এবং সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
সরকারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, দেশে আপাতত তেলের কোনো সংকট নেই। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নতুন উৎস থেকেও জ্বালানি আসছে। ফলে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা নেই।

