মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ভোজ্যতেল, চিনি এবং মসলার দাম দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোতে দাম চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্ন—এই তিনটি কারণ মিলেই বাংলাদেশের বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি করছে। বিশেষ করে ঈদের পর থেকে সরবরাহ কিছুটা সংকীর্ণ হতে শুরু করেছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে রমজানকালীন বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকায় তেমন দামের ওঠা-নামা দেখা যায়নি। তবে ঈদের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। একজন ব্যবসায়ী জানালেন, “বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি নেই, কিন্তু আমদানি ব্যাহত হওয়ায় কিছু পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে।”
ভোজ্যতেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। খাতুনগঞ্জে এক মণ সয়াবিন তেল এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭,৪০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৬,৬০০ টাকা। পাম তেলের দামও বেড়ে ৬,৪৫০ টাকা হয়েছে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে বোতলজাত তেলের দাম স্থির থাকলেও খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি মণে প্রায় ১,২০০ টাকা বেড়ে ৬,৬০০ থেকে ৬,৭০০ টাকায় পৌঁছেছে। খুচরা পর্যায়ে এটি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি লিটারে ৭–৮ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ মূলত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেল এবং কাঁচামাল আমদানি করে। পাম তেল আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের রুট ব্যবহার না করলেও বৈশ্বিক বাজারের দাম বাড়ার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চে পাম তেলের গড় দাম টনপ্রতি ১,১০৩ ডলারে পৌঁছেছে। সয়াবিন তেলের দাম আরও দ্রুত বেড়ে টনপ্রতি ১,৪৮২ ডলারে উঠেছে, যা এক মাসে প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আমদানিকারকরা জানান, কাঁচামালের দাম আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মসলা ও শুকনো ফলের ক্ষেত্রে। এসব পণ্যের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে। পেস্তার দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে কেজিতে ৪,১০০ টাকায় পৌঁছেছে। টক বরইয়ের দাম ১৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে ১,৩২০ টাকা হয়েছে। কিসমিস, জিরা, জয়ফল ও জয়ত্রীর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ সীমিত হওয়ায় যেকোনো বিঘ্ন বাংলাদেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়।
চিনির দাম তুলনামূলক কম হারে বাড়লেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। এক মণ চিনি বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩,৫৫০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩,৪২০ টাকা। বিশ্ববাজারে মার্চে চিনির দাম কেজিপ্রতি ০.৩৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ০.৩১ ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দামের চাপের বড় কারণ হলো জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে খরচ ছিল প্রায় ৩৫ ডলার, এখন তা বেড়ে ৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে জরুরি সারচার্জ আরোপ করেছে। বিভিন্ন রুটে কনটেইনার প্রতি অতিরিক্ত হাজার হাজার ডলার খরচ যোগ হচ্ছে। এর ফলে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ অতিরিক্ত খরচের বোঝা বহন করছে।
বাজারে পণ্যের ঘাটতি নেই, তবে পণ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ফলে সরবরাহ কম মনে হচ্ছে এবং আতঙ্কিত কেনাকাটাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে নিয়ন্ত্রণ সীমিত, তাই বড় ব্যবসায়ীরা দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছেন।

