গত ডিসেম্বর থেকে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় ভোক্তারা পড়েছেন বাড়তি চাপের মধ্যে। ১২ কেজির সিলিন্ডার এলাকা ভেদে দুই থেকে সাতশ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তৎপরতা বাড়িয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট অপারেটররা।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি কিছুটা বাড়লেও খুচরা বাজারে এখনো দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আগের বছরের তুলনায় বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। তবুও ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে সরবরাহ পুরোপুরি থেমে নেই। আমদানিকারকরা বলছেন, আপাতত বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় এপ্রিল মাসজুড়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু মে মাস নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন সরবরাহ চেইন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অপারেটররা।
আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলপিজির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতের প্রভাবে ওই অঞ্চলে সরবরাহ উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে আমদানি খরচ বাড়ছে। এ অবস্থায় মাসের মাঝামাঝি সময়েও এলপিজির দাম সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান বলেন, “দেশে এখন যে এলপিজি মজুত রয়েছে, তাতে পুরো এপ্রিল মাস চলবে। তবে মে মাসে সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওমান থেকে আমাদের প্রতি মাসে ২০ হাজার টন এলপিজি দেওয়ার চুক্তি থাকলেও তারা জানিয়েছে মে মাসে মাত্র ৬ হাজার টন দিতে পারবে।” তিনি আরও বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার কারণে কিছু প্ল্যান্ট বন্ধ রয়েছে। এগুলো চালু হতেও সময় লাগবে। তাই আমাদের বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে।”
দেশে এলপিজি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি গৃহস্থালিতে হলেও পরিবহন ও শিল্প খাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মাত্র আড়াই শতাংশ আসে দেশীয় উৎস থেকে। বাকি অংশ আমদানি নির্ভর।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। একই সময়ে দেশীয় তিনটি রিফাইনারি ও সরকারি এলপিজিএল মিলে সরবরাহ করেছে ৪৫ হাজার ৬৩০ টন। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছরে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টন। তবে ২০২৫ সালে আমদানিতে পতন দেখা যায়। ২০২৪ সালে যেখানে আমদানি ছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার টন, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টনে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন। অর্থাৎ এক বছরে ডিসেম্বর মাসে আমদানি কমেছে ১৮ হাজার ৮৬৬ টন।
জানুয়ারিতে একই ধারা অব্যাহত থাকলেও ফেব্রুয়ারি ও মার্চে চিত্র বদলায়। এই দুই মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি বৃদ্ধি পায়। মোট আমদানি হয় ৩ লাখ ৮২ হাজার টন। এর মধ্যে মার্চ মাসেই এসেছে ২ লাখ ১১ হাজার টন, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি হয় ১ লাখ ৭১ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
এ বিষয়ে লোয়াব সভাপতি আমিরুল হক বলেন, “আমরা দেশের জন্য কাজ করছি। সংকটের কথা বলা হলেও ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। এটি ইতিবাচক। আমরা চাই মানুষ স্বস্তিতে থাকুক, কোনো প্যানিক তৈরি না হোক।” তিনি আরও বলেন, সরকারি দামে বিক্রির বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে বিবৃতি দিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকে এলপিজি আমদানি করা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারদর কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিএম এনার্জির এই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা ওমানের সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তবে এপ্রিলের পর পরিস্থিতি অনিশ্চিত। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মালয়েশিয়া থেকে আসা ‘মর্নিং জেইন’ জাহাজ থেকে আড়াই হাজার টন এলপিজি খালাস চলছে। ৫ এপ্রিল খালাস হয়েছে ২ হাজার ৬০০ টন বহনকারী ‘গ্যাস জার্নি’ নামের জাহাজ থেকে। ১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে আরও ১০ হাজার টন এলপিজিবাহী জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
এদিকে চলতি এপ্রিল মাসে সৌদি আরামকো এলপিজির সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) মার্চের তুলনায় ৪৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর প্রভাবে সরকার ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে বাজারে তা আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে—১ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে এলপিজি বাজারে এখন সরবরাহ স্বস্তি থাকলেও দাম ও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

