ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে। এই সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্লেষকদের হিসাব এবং রয়টার্সের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই সময়ে কম উৎপাদিত তেলের মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার।
এই বিপুল ঘাটতির প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বরং আগামী কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনুভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংকটের শুরু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। আন্তর্জাতিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট সরবরাহ কমেছে ৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি। আধুনিক জ্বালানি ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় বিঘ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই হারানো ৫০ কোটি ব্যারেল তেলের প্রভাবকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্লেষকেরা। উড ম্যাকেঞ্জির প্রধান বিশ্লেষক আয়ান মাওয়াটের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ তেল দিয়ে বৈশ্বিক বিমান চলাচলের জ্বালানি চাহিদা প্রায় ১০ সপ্তাহ বন্ধ রাখা সম্ভব হতো। একইভাবে, পুরো বিশ্বে ১১ দিন সব ধরনের সড়ক যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা যেত, অথবা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য পাঁচ দিনের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা যেত।
রয়টার্সের আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পরিমাণ তেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক মাস এবং ইউরোপের এক মাসের বেশি সময়ের চাহিদার সমান। পাশাপাশি এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রায় ছয় বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমান, যেখানে ২০২১ অর্থবছরে বার্ষিক ব্যবহার ছিল প্রায় আট কোটি ব্যারেল। এ ছাড়া এই তেল দিয়ে প্রায় চার মাস আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল চালানো সম্ভব হতো।
চলমান পরিস্থিতিতে মার্চ মাসে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল কমেছে। এই পরিমাণ উৎপাদন হ্রাস বিশ্বের শীর্ষ দুই জ্বালানি কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের সম্মিলিত উৎপাদনের কাছাকাছি। একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের জেট জ্বালানি রপ্তানিতেও বড় ধস নেমেছে। কেপলারের তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারিতে যেখানে রপ্তানি ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ব্যারেল, সেখানে মার্চ ও এপ্রিল মিলিয়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪১ লাখ ব্যারেলে।
এই ঘাটতির অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল। যুদ্ধ শুরুর পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছায়। কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোহানেস রাউবালের হিসাব অনুযায়ী, সরবরাহ ঘাটতির মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার, যা জার্মানির বার্ষিক জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান। এটি লাটভিয়া বা এস্তোনিয়ার মতো ছোট দেশের পুরো অর্থনীতির সমান হিসাবেও ধরা হচ্ছে।
এদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইসরায়েল–লেবাননের যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যুদ্ধের অবসানে ‘শিগগিরই’ একটি চুক্তি হতে পারে, যদিও এর সময়সীমা এখনো অনিশ্চিত।
তবে সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসেই বৈশ্বিক স্থলভিত্তিক তেল মজুত প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এই চাপ দিনে দিনে বাড়ছে। বিশেষ করে কুয়েত ও ইরাকের ভারী তেলক্ষেত্রগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় নিতে পারে।
এর পাশাপাশি পরিশোধন সক্ষমতার ক্ষতি এবং কাতারের রাস লাফান এলএনজি কমপ্লেক্সে হামলার কারণে এই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

