যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার যে চুক্তিটি তাড়াহুড়া করে সম্পন্ন করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই চুক্তির প্রভাব এখন আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসছে।
বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা দিয়ে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
অনেক রাজনৈতিক নেতা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন এক নীতিগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে, যেখানে দেশের স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত বা প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত চুক্তি করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি বা নিরাপত্তাজনিত ব্যাখ্যা সেই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের শর্ত যদি সত্যিই কার্যকর থাকে, তাহলে তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এই চুক্তিকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ ‘দাসত্বের চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর প্রভাবসম্পন্ন চুক্তি করার নৈতিক বা রাজনৈতিক এখতিয়ার ছিল না। তাঁর মতে, বাণিজ্যচুক্তির নামে বাস্তবে এমন কিছু শর্ত যুক্ত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তকে সীমিত করে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, চুক্তিটি যথেষ্ট স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের সামনে আনা হয়নি।
বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকেরা বলছেন, ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার এই বিশাল ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা হওয়া দরকার ছিল। দেশের অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থা, বিমান খাতের বাস্তব চাহিদা এবং বিকল্প উৎস থেকে ক্রয়ের সুযোগ—এসব বিষয় বিবেচনা না করে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক অভিযোগ করেছেন, চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তকে সীমিত করতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো প্রকল্প বা চুক্তিকে নিজের বাণিজ্যিক বা নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তাহলে বাংলাদেশ সেই পথে এগোতে বাধার মুখে পড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি পারমাণবিক প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম আনার ক্ষেত্রেও এই চুক্তি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এই উদ্বেগ শুধু রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে যদি বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে হয় এবং একই সঙ্গে অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দরকষাকষির সুযোগ কমে যায়, তাহলে তা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে। একটি বাণিজ্যচুক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত পারস্পরিক সুবিধা, কিন্তু যদি সেটি এক পক্ষের ওপর বেশি চাপ তৈরি করে, তাহলে তা ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
বর্তমান বিতর্কের একটি বড় দিক হলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব সিদ্ধান্তের পার্থক্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী রাজনীতিক ও সমালোচকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং তার পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো দেখে মনে হচ্ছে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও এক আলোচনায় মন্তব্য করেছেন, সরকারের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাকসহ অনেক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্ক কি ন্যায্যতা, সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে হবে, নাকি এমন শর্তে হবে যা বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে?
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি কূটনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই এমন কোনো চুক্তি যদি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে প্রভাবিত করে, তাহলে সেটি সংসদে উত্থাপন, জনসমক্ষে প্রকাশ এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা জরুরি। গোপনীয়তা বা তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
চুক্তি পর্যালোচনার সময়সীমা নিয়েও এখন আলোচনা চলছে। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেছেন, বাংলাদেশ চাইলে ৯ মে এর মধ্যে এই চুক্তি বাতিল বা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিতে পারে। তাঁর দাবি, জনগণের স্বার্থে বর্তমান সরকারের উচিত অন্তর্বর্তী সরকারের করা চুক্তির দায় নিজের কাঁধে না নেওয়া। সাইফুল হকও একই ধরনের অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, সরকার চাইলে সংসদের দল, সংসদের বাইরের রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে পারে।
এই প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এমন চুক্তি কোনো একক দল, সরকার বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত কোনো চুক্তি হলে সেখানে জাতীয় ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যদি চুক্তির শর্ত ভবিষ্যতে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা বা প্রযুক্তিগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তাহলে তা শুধু সরকারের বিষয় নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের বিষয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দেশ কি স্বল্পমেয়াদি কূটনৈতিক সুবিধা বা বাজার রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে ফেলবে, নাকি সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে? যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই বাজার ধরে রাখার জন্য যদি দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় মূল্য দাবি করতে পারে।
এই চুক্তি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরকার যদি মনে করে চুক্তিটি দেশের স্বার্থে, তাহলে সেটির পূর্ণ ব্যাখ্যা জনগণের সামনে আনা উচিত। আর যদি দেখা যায় চুক্তির মধ্যে অসম, ঝুঁকিপূর্ণ বা সার্বভৌমত্ববিরোধী শর্ত রয়েছে, তাহলে ৯ মে এর আগেই তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের দরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে শক্তিশালী, সম্মানজনক ও ন্যায্য সম্পর্ক। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, নির্ভরতার ভিত্তিতে নয়। বাণিজ্য দরকার, বাজার দরকার, বিনিয়োগ দরকার—কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। কারণ, কোনো দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় চুক্তিতে নয়; উন্নয়ন নির্ভর করে সে দেশ নিজের স্বার্থে কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার ওপর।

