বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে পোশাক আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উচ্চ সুদের হার, ভোক্তা ব্যয় হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশটির পোশাক আমদানির বাজার সংকুচিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও। তবে মে মাসের তথ্য বলছে, বছরের শুরুতে যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণও ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার এবং ভোক্তাদের ব্যয়সংযমের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিকে চাপের মধ্যে রেখেছে।
এই সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৪৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি মূল্য কমেছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ।
রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৮৫ মিলিয়ন এসএমই (স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট) পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কম। একই সঙ্গে ইউনিট মূল্যও কিছুটা কমেছে। গড় মূল্য ৩ দশমিক ০৫ ডলার থেকে কমে ২ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমেছে। ফলে শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, প্রতি ইউনিট পণ্যের গড় মূল্যেও চাপ দেখা গেছে।
যদিও পাঁচ মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক, মে মাসের তথ্য কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ৫৮২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণও ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে ইউনিট মূল্য সামান্য, অর্থাৎ ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শুরুতে যে দুর্বল ক্রয়াদেশ ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই প্রবৃদ্ধি। আগামী মাসগুলোতে অর্ডার বাড়তে থাকলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ইতিবাচক অবস্থান ধরে রেখেছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান। পাঁচ মাসে চীনের রপ্তানি কমেছে ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ভারতের ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক বাজার সংকুচিত হলেও সব দেশ একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছু দেশ পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমলেও মে মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, বছরের শুরুতে দুর্বল থাকা ক্রয়াদেশের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তবে এটিকে এখনই স্থায়ী পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগামী কয়েক মাসের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেই প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।
তিনি আরও বলেন, ওটেক্সার তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের বড় ধরনের অংশীদারিত্ব কমে যাওয়া। বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করছেন। কিন্তু এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশও সুযোগ পেলেও সেটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাংলাদেশের শক্তি রয়েছে বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং পরিবেশবান্ধব কারখানায়। তবে ভবিষ্যতে আরও ভালো অবস্থানে যেতে হলে দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাকের উৎপাদন বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
চলতি বছরের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের উল্লেখযোগ্য পতন। মাত্র পাঁচ মাসে দেশটির পোশাক রপ্তানি মূল্য ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্কনীতি এবং ক্রেতাদের বিকল্প উৎপাদন উৎস খোঁজার প্রবণতার কারণে চীনের ওপর নির্ভরতা কমছে। তবে এ সুযোগের বড় অংশ এখন পর্যন্ত ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলক বেশি কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানিতে চাপ তৈরির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বছরের শুরুতে দুর্বল ক্রয়াদেশ, উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সতর্ক ক্রয়নীতি, দ্রুত সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের ঘাটতি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের তুলনায় তুলনামূলক কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতাও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
প্রথম পাঁচ মাসের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজার এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিও চাপের মুখে রয়েছে। তবে মে মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন করে অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই ধারা যদি আগামী কয়েক মাসও অব্যাহত থাকে, তাহলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে চীনের বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ায় যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে আরও জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। অন্যথায় সম্ভাব্য বাজারের বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছেই থেকে যাবে।

