দেশে বছরে ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক বাজার থাকলেও অধিকাংশ কাঁচামাল এখনও আমদানিনির্ভর। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো—বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ওষুধ, চামড়া, কৃষি ও প্লাস্টিক খাত—বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশের বাজারের আকার দ্রুত বাড়লেও প্রয়োজনীয় অধিকাংশ রাসায়নিক এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, একটি শক্তিশালী দেশীয় রাসায়নিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে শুধু আমদানি নির্ভরতা কমবে না, বরং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত “রপ্তানিমুখী শিল্পে রাসায়নিক নির্ভর পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের রাসায়নিক বাজারের আকার প্রায় ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর এই বাজার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় বাজারের বড় অংশই আমদানিকৃত পণ্যের দখলে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পেই ২ হাজার ৫০০টির বেশি ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রং, সহায়ক রাসায়নিক এবং ফিনিশিং উপাদান। একইভাবে ওষুধ শিল্পে প্রয়োজন হয় সক্রিয় ওষুধ উপাদান, বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ ও দ্রাবক। অন্যদিকে চামড়া শিল্পও ট্যানিং কেমিক্যাল ও রংয়ের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে দেশের মোট আমদানির প্রায় ১০ শতাংশই রাসায়নিক পণ্য। অথচ রাসায়নিক পণ্যের আমদানির পরিমাণ রপ্তানির তুলনায় ১৫ গুণেরও বেশি।
ওষুধ শিল্প বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে পণ্য রপ্তানি করলেও উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ সক্রিয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কোনো সংকট দেখা দিলে শিল্পও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশে রাসায়নিক শিল্পের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ক, জটিল করব্যবস্থা, পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং লজিস্টিক সমস্যাসহ নানা নীতিগত প্রতিবন্ধকতা।
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে একটি নির্ভরযোগ্য দেশীয় রাসায়নিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। কারণ কাঁচামালের জন্য অতিরিক্ত বিদেশ নির্ভরতা উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও দুর্বল করে।
কৃষি রাসায়নিক খাতের প্রতিনিধিরা কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক কমানোর দাবি জানান। অন্যদিকে ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলেন, সক্রিয় ওষুধ উপাদান উৎপাদনের জন্য গড়ে তোলা শিল্পপার্কের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনের সুযোগ সীমিত হয়ে আছে।
চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারাও আমদানি পর্যায়ের শুল্ক কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু শিল্প স্থাপন করলেই হবে না; পুরো রাসায়নিক খাতের জন্য একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পনীতি পুনর্বিন্যাস, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তাদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পে যেভাবে সরকারের নীতিগত সহায়তায় পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে, একই ধরনের সহায়তা রাসায়নিক শিল্পেও দেওয়া গেলে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
তারা আরও বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে এই খাত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিরা জানান, স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে ধীরে ধীরে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল করা হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরে রাসায়নিক খাতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় পশ্চাৎ-সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়বে, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের শিল্পভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে কাঁচামালের জন্য অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী দেশীয় রাসায়নিক শিল্প গড়ে তোলা শুধু শিল্প খাতের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

