চোরাচালান ও আমদানি-রপ্তানি আইন লঙ্ঘনের মতো নানা অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত হওয়া পণ্য নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। নিলামের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণির পণ্য সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা প্রয়োজনে ধ্বংস করার বিস্তারিত পদ্ধতি এই নতুন নির্দেশিকায় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে এ–সংক্রান্ত একটি নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করা হয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে জারি হওয়া এই আদেশের ফলে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জারি করা আগের নির্দেশিকা বাতিল হয়ে গেছে। কাস্টমস আইনের নির্দিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে এই নতুন আদেশ কার্যকর করা হয়েছে, যদিও পচনশীল পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আগের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনগুলো বহাল থাকছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টমস, বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ যেকোনো আটককারী সংস্থাকে আটক পণ্য নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দিতে হবে। মূল্যবান ধাতু, হীরা, জুয়েলারি বা বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ প্রয়োজন হবে, আর সনদ না থাকলে এসব পণ্য সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা যাবে।
সাধারণ পণ্য অফিস চলাকালীন সময়ে গ্রহণ করা হলেও পচনশীল পণ্য যেকোনো সময় জমা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পণ্য জমার সময় বিস্তারিত আটক প্রতিবেদন এবং গুদাম রেজিস্টারে মডেল, ব্র্যান্ড, পরিমাণ ও মূল্যসহ তথ্য লিপিবদ্ধ করার নিয়মও রয়েছে। মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা পুলিশ প্রহরায় দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংক বা ট্রেজারিতে জমা দিতে হবে, আর বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলেও একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।
আটক পণ্য চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির আগে প্রকৃত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক বা দাবিদারকে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সাত কর্মদিবসের নোটিশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যা ডাক, ই-মেইল, পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি বা ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠানো যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি প্রমাণিত হলে এবং শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধ করলে পণ্য খালাসের সুযোগ মিলবে। অন্যথায় পণ্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে পরবর্তী নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে।
পণ্য বিক্রির প্রধান মাধ্যম হিসেবে রাখা হয়েছে বোর্ডের চালু করা লাইভ ই-অকশন পদ্ধতি। এটি সম্ভব না হলে প্রকাশ্য, তাৎক্ষণিক বা সিল্ড নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে। এর আগে নির্দিষ্ট কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিলাম কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনে অন্য সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও যুক্ত করা যাবে।
কিছু বিশেষ শ্রেণির পণ্য সরাসরি নির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের বিধানও রাখা হয়েছে নতুন আদেশে। যেমন নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত পণ্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছে ছাড়কৃত মূল্যে বিক্রি করা যাবে, চিনি-লবণ-ডালের মতো পচনশীল পণ্য প্রয়োজনে টিসিবির কাছে যাবে, সোনা-রূপা-হীরা জমা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে, আর বিস্ফোরক ও অস্ত্র-গোলাবারুদ যাবে প্রতিরক্ষা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এছাড়া মদ ও বিদেশি সিগারেট পর্যটন করপোরেশনের কাছে, প্রত্নসম্পদ জাদুঘরে এবং প্রাণী বা প্রাণীর দেহাবশেষ বন বিভাগের কাছে বিনামূল্যে হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল নির্দিষ্ট অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে।
নিলামে অংশ নিতে প্রাতিষ্ঠানিক দরদাতাদের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, টিআইএন সনদ ও আয়কর রিটার্নের প্রমাণ থাকতে হবে, আর ব্যক্তি দরদাতাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিআইএন সনদ প্রয়োজন হবে। প্রতিটি লটের সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ ফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে।
নিলামের অন্তত সাত কর্মদিবস আগে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ক্রেতাদের পণ্য পরিদর্শনের সুযোগ এবং নিলামের দুদিন আগে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের নিয়ম রাখা হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতির নিলামে সংরক্ষিত মূল্যের অন্তত ৬০ শতাংশ দর পাওয়া গেলে বিক্রির সুপারিশ করা হবে, নয়তো দ্বিতীয়-তৃতীয় দফা নিলাম হবে এবং শেষ পর্যন্ত বিক্রি না হলে মেগালট গঠন করে পরবর্তী নিলামে তোলা যাবে। তবে ই-নিলামে প্রথম দফাকেই চূড়ান্ত ধরা হবে।
বিক্রয়াদেশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্য ও কর পরিশোধ করে পণ্য খালাস নিতে হবে, নয়তো জামানত বাজেয়াপ্ত করে পণ্য পুনরায় নিলামে তোলা হবে।
নিলামে পাওয়া অর্থ নির্দিষ্ট ক্রম অনুসারে বণ্টন করা হবে— প্রথমে বিক্রয় ব্যয়, এরপর ফ্রেইট, তারপর সরকারি শুল্ক-কর এবং সবশেষে জিম্মাদারের পাওনা। অবশিষ্ট অর্থ থাকলে তা মালিকের আবেদন সাপেক্ষে ফেরত দেওয়া যাবে। নিলামে জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
বিক্রি সম্ভব না হওয়া মদ, নিষিদ্ধ পণ্য বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ধ্বংসের সুযোগও রাখা হয়েছে আদেশে। এ জন্য কাস্টমস, প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হবে ধ্বংস কমিটি। ধ্বংসের আগে বিস্তারিত ইনভেন্টরি তৈরি এবং কমিটির সদস্যদের অন্তত পাঁচ দিন আগে অবহিত করার নিয়ম রাখা হয়েছে, আর ধ্বংস শেষে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কমিশনারের কাছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিলাম প্রক্রিয়ায় ই-অকশনের ওপর জোর দেওয়া এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে দেওয়ার এই উদ্যোগ আটক পণ্য নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলার ওপর।

