দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নথি স্বাক্ষর করা হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তৈরি’। এর আওতায় দেশের প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা কইকা এই প্রকল্পের জন্য ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত চার বছর মেয়াদে প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে সরকারি সেবাতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে আগামী দিনের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ মানুষের চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
নতুন এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রযুক্তি পেশাজীবীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে শক্তিশালী জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা অর্জনের মধ্যে প্রকল্পটিকে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও উৎসাহিত করা হবে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্রচলিত প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে দেশের তরুণদের জন্য দেশ-বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে জ্ঞান ও গবেষণা তৈরি হয়, তার সঙ্গে বাস্তব ব্যবসায়িক প্রয়োজনের সরাসরি সংযোগ থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর নতুন করে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হয়।
এই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যেই শিল্প প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তি পেশাজীবীরা বাস্তব সমস্যার ওপর কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং শিল্প খাতও প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করার বিষয় হিসেবেও দেখছে না প্রকল্পটি। দেশের নিজস্ব সমস্যার সমাধানেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবহণ, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি সেবার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরি করা গেলে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে কৃষিক্ষেত্রে ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ কিংবা উৎপাদন পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে রোগ শনাক্তকরণ ও তথ্য বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা খাতে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। সরকারি সেবায় বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু প্রযুক্তি কেনা বা বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহার করলেই হবে না। প্রয়োজন হবে নিজস্ব দক্ষ জনবল। নতুন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই। দেশে যদি পর্যাপ্ত দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, প্রযুক্তি তৈরি ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
এই উদ্যোগ দেশের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। উন্নত প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি পেশাজীবীরা দেশের ভেতরে যেমন কাজের সুযোগ পাবেন, তেমনি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াতেও বাংলাদেশি প্রযুক্তি পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উন্নত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও শিল্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের পেশাজীবীদের কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এর ফলে দেশে এবং বিদেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায়, বাংলাদেশি প্রযুক্তি পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে প্রকল্পটি।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। দক্ষতার মান, প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির কারণে আজ যে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কয়েক বছর পর তার সঙ্গে নতুন অনেক দক্ষতা যুক্ত হতে পারে। তাই একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেশটি প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্প উৎপাদন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা তৈরিতে কোরিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে প্রকল্পটির সুফল আরও বাড়তে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়াসহ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রকল্পটির বাস্তবায়নসংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এশিয়া, যৌথ অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অর্থায়নসংক্রান্ত শাখার অতিরিক্ত সচিব ও প্রধান মাসুমা আক্তার। দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার পক্ষে স্বাক্ষর করেন সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক জিহুন কিম।
সব মিলিয়ে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের পর কতজন দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হচ্ছে, তারা কতটা বাস্তব প্রযুক্তি সমস্যার সমাধান করতে পারছেন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে তার ওপর।
বিশ্ব যখন দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন শুধু এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা নয়; বরং এই প্রযুক্তি তৈরি, পরিচালনা ও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর মতো দক্ষ মানুষ তৈরি করা। দক্ষিণ কোরিয়ার ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদানে শুরু হতে যাওয়া এই প্রকল্প সেই সক্ষমতা তৈরির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

