কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাণিজ্য এখন দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালকের মতে, এই উত্থান শুল্কসহ নানা সংকটের প্রকৃত প্রভাব ঢেকে রেখেছে। এআইয়ে বিনিয়োগের গতি কমলে বিশ্ব বাণিজ্যের আসল দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সংস্থাটির মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-আইওয়েলা জেনেভায় ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, এআই-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের দ্রুত প্রবৃদ্ধি শুল্ক ও অন্যান্য সংকটের নেতিবাচক প্রভাবকে আড়াল করছে।
সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাণিজ্য আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে আছে সেমিকন্ডাক্টর, রাসায়নিক পণ্য ও শিল্প সরঞ্জাম। এসব পণ্য এআই অবকাঠামো ও তথ্যকেন্দ্র গড়তে লাগে। একই সময়ে এআইবহির্ভূত পণ্যের বাণিজ্য বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। দুই হারের ব্যবধান বিশাল।
এই ব্যবধান কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় বাণিজ্যের অংশ দেখলে। ওই প্রান্তিকে বিশ্বের মোট পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশই ছিল এআই-সংক্রান্ত পণ্য। অর্থাৎ পাঁচ ডলারের বাণিজ্যের প্রায় এক ডলার এখন এই খাতের। একটি খাতের ওপর বৈশ্বিক বাণিজ্যের এতটা নির্ভরতা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৫ সালেও এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। সংস্থাটি শুরুতে অনুমান করেছিল, ওই বছর বিশ্বের পণ্য বাণিজ্য বাড়বে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থার অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই অবকাঠামো গড়ার পণ্যের বাণিজ্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় এই ফারাক তৈরি হয়েছে। প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির পেছনে এই একটি খাতের অবদান কম নয়।
এই উত্থানের পটভূমিও উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি, বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এআই খাত বৈশ্বিক বিনিয়োগের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গত মাসে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামলাচ্ছে। এর পেছনে এআই খাতের বিনিয়োগের ভূমিকা আছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে পরিস্থিতি আবার কঠিন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, চাপ পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও।
এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিমাণ চোখ ধাঁধানো। ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের হিসাবে, ২০২৬ সালে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআইয়ের উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৮০ হাজার কোটি ডলার ঢালতে পারে। এই বিপুল অর্থ যতদিন প্রবাহিত হবে, ততদিন সেমিকন্ডাক্টর, রাসায়নিক, শিল্প সরঞ্জাম ও তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাহিদা থাকবে।
কিন্তু এই দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে সতর্কতাও বাড়ছে। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, দুজনেই এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানোর প্রয়োজনের কথা বলেছেন। মূল উদ্বেগ এআইয়ের নিরাপত্তা ও এর বিস্তৃত সামাজিক প্রভাব ঘিরে।
মহাপরিচালকের আশঙ্কা, এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগে কোনো ‘বুদবুদ’ তৈরি হয়ে থাকলে এবং তা ফেটে গেলে বর্তমান বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। তখন ক্ষতি শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু দেশের কারখানা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।
এই সুফলও সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ওকোনজো-আইওয়েলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি ছিল এশিয়ার দখলে। আর একই সময়ে বিশ্বের মোট ঝুঁকি মূলধন বিনিয়োগের ৭৬ শতাংশ গেছে উত্তর আমেরিকায়। তাঁর মতে, এআই বিস্তারের সুবিধা মূলত উৎপাদন ও বিনিয়োগে সক্ষম দেশগুলোর হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বার্তা আছে। যাদের এআই পণ্য বানানোর সক্ষমতা নেই এবং বড় বিনিয়োগও আসছে না, তারা এই জোয়ারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অথচ এআইবহির্ভূত পণ্যের ধীর প্রবৃদ্ধির প্রভাব তাদের রপ্তানিতেই বেশি পড়তে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মনে করে, এআই এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে দেশগুলোর মধ্যে আরও সহযোগিতা দরকার। এখন প্রতিটি দেশ নিজের মতো করে এআই নিয়ন্ত্রণের নিয়ম তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম চালু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যবসার খরচ ও জটিলতা বাড়তে পারে।
সংস্থাটি নিজেও চাপে আছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও চীনের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে। এসব কারণে সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ওকোনজো-আইওয়েলা সতর্ক করেছেন, বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হলে দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। সংস্থার বার্ষিক বিশ্ব বাণিজ্য প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলছে, আধুনিকায়ন না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সংস্কারের উদ্যোগ অবশ্য মার্চে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সংস্থার দুই বছর পরপর হওয়া মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রীরা সংস্কারের রোডম্যাপ নিয়ে একমত হতে পারেননি। তবে মহাপরিচালক বলছেন, আলোচনা থেমে নেই, জেনেভায় তা আবার শুরু হয়েছে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সদস্য দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে, সংস্কার জরুরি এবং বর্তমান ব্যবস্থা আগের মতো রেখে দেওয়া আর সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট। বিশ্ব বাণিজ্যের ভালো সংখ্যাগুলো একটি খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করছে। সেই খাতের গতি কমলে শুল্ক, জ্বালানির দাম ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আসল চাপ সামনে চলে আসবে। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য এখনকার প্রবৃদ্ধি স্বস্তির চেয়ে সতর্কতার কারণ বেশি।

