দেশের ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেন সেবা গত রোববার রাত থেকে বন্ধ ছিল। তিন দিন পর গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে কিউ-ক্যাশের সব সেবা আবার চালু হয়েছে। এই অচলাবস্থার কারণ নিয়ে এবার ব্যাখ্যা দিয়েছে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আইটিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত রুশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘কম্পাস প্লাসের’ সঙ্গে সফটওয়্যার স্থানান্তর নিয়ে বিরোধের জেরেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
আইটিসিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাসেলসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের তৈরি এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ে৪’ দিয়ে তাদের বর্তমান প্ল্যাটফর্ম প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ খবর জানতে পেরে রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভারে একটি ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়। ওই স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভারগুলো রিস্টার্ট করত। এতে রাউটিং টেবিল মুছে যায় এবং পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বন্ধ হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ আইটিসিএলের নিজস্ব বক্তব্যনির্ভর। কম্পাস প্লাসের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কাজী সাইফুদ্দিন মুনির বলেন, সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকাশসহ সব অংশীদার ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছিল।
বিরোধের সূত্রপাত আগস্টে। ওই মাসে আইটিসিএল জানায়, ১২ থেকে ১৮ মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্ম ধাপে ধাপে বাদ দেওয়া হবে। অভিযোগ রয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় রুশ প্রতিষ্ঠানটি কারিগরি সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১৫ লাখ ডলার স্থানান্তর ফি দাবি করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত অগ্রিম পেমেন্ট গ্যারান্টিও চায়।
অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও আইটিসিএলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা হয়। তবে আইটিসিএল কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এটি স্পষ্টভাবে একটি কারিগরি সমস্যা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তা সামাল দিতে না পারায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, হঠাৎ সেবা বন্ধ করার কারণে সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি খুদে বার্তার মাধ্যমে জনসাধারণকে যথেষ্ট সময় আগে জানানো বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আইটিসিএলের সিস্টেম স্থানান্তরের কাজ অক্টোবরের শেষ দিকে হওয়ার কথা ছিল। এক কর্মকর্তা জানান, রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ জানায়, জরুরি ভিত্তিতে সেবা অফলাইনে নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, জরুরি পরিস্থিতি তাদের এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু ওই কর্মকর্তার মতে, পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই ঘটনায় দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, একটি বিদেশি ভেন্ডরের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের পেমেন্ট অবকাঠামোকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ব্যবহার হলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে। দ্বিতীয়ত, জরুরি পরিস্থিতিতেও গ্রাহকদের আগাম জানানোর নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ব্যাংক একই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহককে ভোগান্তিতে ফেলেছে।
তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট সত্যিই রুশ প্রতিষ্ঠানই বসিয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়েছে কি না, জানা যায়নি। কত গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এর আর্থিক প্রভাব কত, সে তথ্যও নেই। অচলাবস্থার শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সিস্টেম আপগ্রেড’-জনিত বিঘ্নের কথা জানিয়েছিল। পরে আইটিসিএল ভিন্ন কারণ জানাল। এই দুই বক্তব্যের ব্যবধান নিয়েও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এখন নজর থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। পুরোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে নতুন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর নির্বিঘ্নে হয় কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রাট ঠেকাতে নিরাপত্তা ও বিকল্প ব্যবস্থা কতটা জোরদার করা হয়, সেটিও দেখার বিষয়।

