চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের সমুদ্রপথের আমদানি রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ আর কনটেইনারের প্রায় ৯৮ শতাংশ যায়। গত বছর এই বন্দর সামলেছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ বন্দর কাজ করছে সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত। কিন্তু সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়টা এই রেকর্ডের ভেতরে নেই। বিষয়টা হলো, এত বড় দায়িত্ব একটা এমন প্রবেশপথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার গভীরতা আর প্রস্থ নির্ভর করে প্রকৃতির উপর।
রেকর্ডের ঠিক পাশেই একটা অস্বস্তির খবর আছে
টিইইউ মানে বিশ ফুট লম্বা একটা কনটেইনার। বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ, আর মোট কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ১৯৭৭ সালে কনটেইনার চালু হওয়ার পর এই প্রথম বছরে ৩৪ লাখ টিইইউ পেরিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও, মানে ২০২৫-২৬ সালে, রেকর্ড হয়েছে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার টিইইউ। কিন্তু লয়েডস লিস্টের তালিকায় বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম এক ধাপ নেমে ৬৮তম হয়েছে, কারণ প্রতিবেদন অনুযায়ী তালিকার ১০০ বন্দরের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে চট্টগ্রামের প্রবৃদ্ধি কম ছিল। এর সঙ্গে আরেকটা হিসাব মেলালে ছবিটা পরিষ্কার হয়। সিপিএর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী চারটি কনটেইনার টার্মিনাল মিলিয়ে বন্দরের বার্ষিক সক্ষমতা ৩৫ লাখ টিইইউ। প্রাপ্ত তথ্যের হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের কাজ সেই সক্ষমতার প্রায় ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ বন্দর ঢিলেমি করছে না, বরং দম ফেলার জায়গাটুকু ফুরিয়ে আসছে।
গভীরতার হিসাবটা আসলে কীভাবে কাজ করে
জাহাজ পানিতে কতটা ডুবে থাকে, সেটাই তার ড্রাফট। যে জাহাজ যত বেশি মাল নেয়, সে তত বেশি ডোবে, আর তত গভীর পানি চায়। চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সাড়ে নয় মিটার ড্রাফটের জাহাজ নিতে শুরু করে। এরপর প্রায় ২৪২ কোটি টাকার ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ হলে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১০ মিটার ড্রাফট ও ২০০ মিটার লম্বা জাহাজ ভেড়ানো শুরু হয়, প্রথম জাহাজ ছিল এমভি কমন অ্যাটলাস। যুক্তরাজ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়ালিংফোর্ড তখন বলেছিল, আরও কিছু ড্রেজিং আর প্রকৌশল কাজ হলে ১১ মিটার ড্রাফট ও ২২৫ মিটার লম্বা জাহাজও সম্ভব। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী যা বললেন, তাতে বাস্তব ছবিটা বোঝা যায়। কর্ণফুলী চ্যানেলের গভীরতা এখন সাড়ে আট মিটার থেকে ১০ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করে, এটা প্রাকৃতিক চ্যানেল বলে ড্রেজিং করে গভীরতা ধরে রাখতে হয়, আর বন্দরটা জোয়ারভাটার ওপর নির্ভরশীল। গড়ে প্রায় ৩০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ এখানে ভিড়তে পারে, যদিও লালদিয়া টার্মিনালের প্রতিবেদনগুলোতে বর্তমান সীমা বলা হচ্ছে প্রায় ২৮০০ টিইইউ। এবার চলুন একটা বিষয় তুলনা করে দেখি। এমএসসি ইরিনা নামের বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনটেইনার জাহাজ বহন করতে পারে ২৪ হাজার ৩৪৬ টিইইউ, মানে চট্টগ্রামে ঢোকা জাহাজের প্রায় আট থেকে নয় গুণ। নদী নিজের মতো করে পলি ফেলে, তাই গভীরতা একবার বাড়িয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। রাস্তায় গর্ত মেরামত না করলে যেমন আবার যানজট ফেরে, নদীর বেলায়ও তেমনই।
কলম্বো ঘুরে আসার আসল দাম
বড় জাহাজ ঢুকতে না পারলে কনটেইনার যায় কীভাবে? ছোট ফিডার জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে কনটেইনার নিয়ে যায় কলম্বো, সিঙ্গাপুর, পোর্ট ক্লাং বা তানজুং পেলেপাসের মতো হাব বন্দরে। সেখানে মাদার ভেসেলে তুলে তবে গন্তব্যে যাত্রা। একে বলে ট্রান্সশিপমেন্ট, আর আমদানির মাল একই পথে উল্টো দিকে আসে। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম থেকে কলম্বো পৌঁছে মাদার ভেসেলে ওঠা পর্যন্ত প্রায় আট দিন লাগে, কলম্বোতে জট হলে লাগে আরও তিন দিন। ইউরোপে প্রথম সরাসরি জাহাজ যাওয়ার সময় বলা হয়েছিল, সরাসরি পথে ১৬ দিন, আর ট্রান্সশিপমেন্টে প্রায় ৪০ দিন। বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান ২০২৪ সালের শুরুতে বলেছিলেন, সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন লাগে, লোহিত সাগর সংকটে লাগবে আরও অন্তত ১০ দিন। দুই হিসাব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রান্সশিপমেন্টের পথে ইউরোপে পৌঁছাতে সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিন লাগে। খরচের দিকটাও আছে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগর সংকটের সময় চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুরে টিইইউ প্রতি ফিডার ভাড়া উঠেছিল ৩০০ ডলারে, কলম্বোতে ২৩০ ডলারে। পোশাক রপ্তানিতে লিড টাইম, অর্থাৎ অর্ডার থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত সময়, সরাসরি টাকার হিসাব। একটা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেরি আর বাড়তি খরচের জন্য ক্রেতারা ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকছেন। এই সংখ্যাগুলো ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের, আজকের হিসাব নয়। তবে কাঠামো যে বদলায়নি, সেটা মন্ত্রীর এ বছরের সংসদীয় বক্তব্যেও আছে, যেখানে তিনি হাব বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলেছেন।
চেইনের সবচেয়ে দুর্বল কড়া কোনটা
এখানে দুটো পুরোনো নীতি কাজে লাগে। প্রথমটা স্কেলের অর্থনীতি। বাসে পঞ্চাশ জন উঠলে মাথাপিছু ভাড়া যেমন কমে, বড় জাহাজে প্রতি কনটেইনারের পরিবহন খরচও তেমনই কমে। পরিবহন ভূগোলের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বড় জাহাজে প্রতি টিইইউয়ের দৈনিক পরিচালন খরচ কমতে থাকে, আর এই সুবিধা পেতে হলে বড় জাহাজ ভেড়ানোর মতো বন্দর লাগে। দ্বিতীয়টা ইলিয়াহু গোল্ডরাটের থিওরি অব কনস্ট্রেইন্টস, যিনি ১৯৮৪ সালে দ্য গোল বইয়ে বলেছিলেন যে কোনো ব্যবস্থার সক্ষমতা মাপা হয় তার সবচেয়ে দুর্বল সংযোগ দিয়ে, ঠিক শিকলের মতো। চট্টগ্রামের সেই দুর্বল কড়া হলো কর্ণফুলী চ্যানেলের গভীরতা। ইয়ার্ডে যত আধুনিক ক্রেনই বসুক, চ্যানেল গভীর না হলে বড় জাহাজ আসবে না, আর বড় জাহাজ না এলে খরচের চাপ থাকবেই। আমার পড়া হলো, বন্দরকে অদক্ষ বলে দেওয়া এখানে ভুল পাঠ হবে। রেকর্ড হ্যান্ডলিং বরং দেখাচ্ছে, বন্দর নিজের সীমার ভেতরে ভালোই খাটছে। সমস্যাটা ভৌগোলিক আর কাঠামোগত।
নতুন মালিক, পুরোনো নদী
এই পরিস্থিতিতেই টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে যাচ্ছে। সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২০২৪ সালের জুন থেকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে আংশিক কাজ শুরু করেছে। ১ অক্টোবর মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, মানে এনসিটির ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির খসড়া অনুমোদন করে, আর ৮ অক্টোবর দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তিতে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে, টার্মিনালের জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা থাকবে সিপিএর হাতে, আর ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। এনসিটির গুরুত্ব বোঝাতে একটা হিসাবই যথেষ্ট। বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪০ শতাংশের বেশি এই টার্মিনাল দিয়ে হয়, আর বন্দরের ১৮টি কোয়ে ক্রেনের ১৪টিই এখানে। চুক্তির আগে ও পরে শ্রমিক আর কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ চলেছে, সই হওয়ার দিন ঢাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। বিরোধীরা বলছেন দেশি অপারেটরই কাজটা পারে, সরকার বলছে মালিকানা থাকছে রাষ্ট্রের হাতে আর আসছে বিনিয়োগ। দুই পক্ষেরই বিবেচ্য কথা আছে। এর বাইরে ৩১ আগস্ট ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের কাজ শুরু করেছে। সেখানে ৬০০০ টিইইউ পর্যন্ত জাহাজ ভিড়বে, বছরে অতিরিক্ত ৮ লাখ টিইইউ সামলানো যাবে, লক্ষ্য ২০৩০ সাল। সংবাদে বলা হয়েছে, তখন বন্দরের মোট সক্ষমতা ৩৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪৩ লাখ টিইইউ হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেছেন, পাঁচ বছরে কনটেইনারের পরিমাণ আরও ১০ লাখ টিইইউ বাড়তে পারে। আমি সাধারণ যোগ করে দেখেছি, ৩৪ লাখের সঙ্গে ১০ লাখ যোগ করলে হয় ৪৪ লাখ। মানে ২০৩০ সালে লালদিয়া চালু হলেও চাপ আগের মতোই থাকতে পারে। আর ৬০০০ টিইইউও এমএসসি ইরিনার চার ভাগের একভাগের কিছু বেশি।
মাতারবাড়ীর গভীরতা নিয়েও একটা প্রশ্ন আছে
গভীর সমুদ্রের ভরসা মাতারবাড়ী আর বে টার্মিনাল। মাতারবাড়ীর নৌপথ ১৬ মিটার গভীর করার পরিকল্পনা, সেখানে প্রায় ৮২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে, আর মন্ত্রী জুলাইয়ে বলেছেন কাজ শেষ করে ২০২৯ সালে চালুর লক্ষ্য। বে টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সিঙ্গাপুরের পিএসএ আলাদা কনটেইনার টার্মিনালে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের কথা আছে, আর সিপিএর সচিবের ভাষায় দুটোই চালু হতে ২০২৯ বা ২০৩০ সাল লাগতে পারে। মনে রাখা দরকার, এই সময়সীমা আগেও সরেছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর লক্ষ্য বলা হয়েছিল ২০২৬ সাল। আরেকটা তথ্য আমার কাছে সবচেয়ে ভাবনার মনে হয়েছে। ভারত থেকে প্রকাশিত একটি বাণিজ্যিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাতারবাড়ীর যে নৌপথ ১৬ মিটার গভীর করে বানানো হয়েছিল, সেখানে কয়েক বছরের মধ্যে পলি জমে কোথাও কোথাও গভীরতা ১০ মিটারে নেমে এসেছে। এই বছরের জুনে সিপিএ সেখানে জরুরি ড্রেজিং শুরু করেছে বলে নিজেরাই জানিয়েছে। অর্থাৎ গভীর বন্দরও গভীরতা ধরে রাখার লড়াই থেকে মুক্ত নয়।
তাহলে বদল এসেছে কি না, বুঝবেন কীভাবে
আমার সারকথা হলো, নতুন টার্মিনাল আর ভালো অপারেটর ইয়ার্ডের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু নদীর গভীরতা কেউ চুক্তি করে বদলাতে পারে না। তাই আগামী কয়েক বছরে ফিডার আর কলম্বো ঘুরে আসার এই হিসাব পুরোপুরি বদলাবে না। যে তিনটা জিনিস চোখ রাখলে বোঝা যাবে সত্যি বদল আসছে কি না, সেগুলো হলো কর্ণফুলী আর মাতারবাড়ীতে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং নিয়মিত চলছে কি না, সরাসরি জাহাজের রুট বাড়ছে কি না, আর মাতারবাড়ী ২০২৯ সালেই চালু হচ্ছে কি না। যে দরজা দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ বাণিজ্য যায়, তাকে শুধু ব্যস্ত দেখলে চলবে না, চওড়া করতেও হবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

