বিশ্ববাজারে চাল ও ভোজ্যতেলের দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছেন না। ঢাকা পোস্টের পর্যালোচনা বলছে, গত তিন বছরে চাল ও সয়াবিন তেলের বাড়তি দামের কারণে একটি পরিবারকে বছরে গড়ে উদাহরণভিত্তিক হিসাবে ৪ হাজার ৬২০ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
সারা দেশের হিসাবে এই বাড়তি ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সভাপতি এর পেছনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, দেশে এক ধরনের নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় এ বছরের অক্টোবরে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা ৭ পয়সা বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। সরু চালের দাম বেড়েছে ৪ টাকা ৮৩ পয়সা বা ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মাঝারি চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা ২৫ পয়সা বা ২ দশমিক ০৪ শতাংশ।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি দর এবং রাজধানীর কয়েকটি এলাকার খুচরা বাজারের তথ্য অনুযায়ী, এখন মোটা চালের দাম ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি ৬২ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। মোটা চালের গড় দর দাঁড়িয়েছে ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা, মাঝারির ৬২ টাকা ৫০ পয়সা এবং সরুর ৭৭ টাকা ৫০ পয়সা।
গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় বাড়ার হার তুলনামূলক কম। মোটা চালের দাম বেড়েছে ১ টাকা ২২ পয়সা বা ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সরু চালের ৪০ পয়সা বা শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ এবং মাঝারি চালের ৭ পয়সা বা শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। এর আগের বছরের অক্টোবরে (২০২৪ থেকে ২০২৫) সরু চালের দাম সবচেয়ে বেশি, ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ বড় ধাক্কাটা এসেছিল আগের বছরেই, আর এখন দাম উঁচু স্তরে অনড় হয়ে আছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। সঙ্গে ধানের দাম বাড়ার প্রভাবও পড়ছে চালে। কারওয়ান বাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আব্দুস সত্তার জানান, ট্রাকভাড়া বাড়ায় কয়েক ধরনের চালের বস্তাপ্রতি দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের আন্তর্জাতিক দর ছিল টনপ্রতি ৫৮৯ ডলার। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে ৩৯২ ডলারে। অর্থাৎ টনপ্রতি ১৯৭ ডলার বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের খুচরা বাজারে চালের দাম হয় অনড় ছিল, নয়তো ক্যাটাগরিভেদে আরও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাদ্য বিপণন বিশ্লেষকেরা এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ দেখছেন। প্রথমত, ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় প্রত্যাশামতো কমেনি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়ার সময় যথাসময়ে সমন্বিত শুল্ক ছাড় মেলেনি। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকটে জাহাজভাড়া, বীমা মাশুল এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের হ্যান্ডলিং খরচ চড়া ছিল। এর সঙ্গে আছে দেশীয় অটো রাইস মিলমালিক ও পাইকারি পর্যায়ে দাম না কমানোর প্রবণতা, যা আমদানির সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি হলেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত খুচরা দাম ২০২৪ সালের এপ্রিলে ছিল লিটারপ্রতি ১৬৭ টাকা। ওই বছরের ডিসেম্বরে তা হয় ১৭৫ টাকা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ১৮৯ টাকা এবং অক্টোবরে ১৯৫ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাম ওঠে ১৯৯ টাকায় এবং সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকায়। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ৩৭ টাকা বা ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। পাঁচ লিটারের বোতলে ভোক্তাকে এখন ১৮৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
খোলা সয়াবিনের দামও বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তা লিটারপ্রতি ১৫৫ থেকে ১৫৮ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ঘোষিত দাম ছিল ১৭৭ টাকা। এখন খোলা সয়াবিন কেজিপ্রতি ১৮২ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক ও ভ্যাট, পরিশোধন এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব থাকে। স্থানীয় বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় বোতলজাত সয়াবিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। অনেক ব্যবসায়ী লাভ কম হওয়ায় বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। মানিকনগরের মুন্না জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী একরাম উদ্দিন জানান, এখন লিটারপ্রতি কমিশন মাত্র ১ টাকা, আগে ছিল ৫ থেকে ৭ টাকা। তাই এই তেল বিক্রিতে তাঁদের আগ্রহ কম।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একটি পরিবার মাসে ৪০ কেজি চাল ও ৫ লিটার তেল ব্যবহার করে। চালের গড় দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়লে মাসে বাড়তি খরচ ২০০ টাকা, বছরে ২ হাজার ৪০০ টাকা। তেলের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের এপ্রিলের ১৬৭ টাকার বদলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকা দিতে হলে পাঁচ লিটারে মাসে বাড়তি ১৮৫ টাকা, বছরে ২ হাজার ২২০ টাকা। দুটি মিলিয়ে বছরে বাড়তি ব্যয় ৪ হাজার ৬২০ টাকা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে পরিবার প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ। প্রতিটি পরিবারের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় সমান ধরলে জাতীয় অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে পরিবারগুলোকে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, এটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব, প্রতিটি পরিবারের ব্যবহার এক নয়।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোক্তার পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই বাড়তি অর্থের ক্ষুদ্র অংশই হয়তো ধানচাষি, কৃষক ও উৎপাদকের হাতে যায়। বড় অংশ যায় চালকলমালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, ভোজ্যতেল আমদানিকারক, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশকদের কাছে। ফলে পরিবারগুলোর হাতে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের জন্য অর্থ কমে যাচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, চাল ও তেলের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁর মতে, এর পেছনে একটি সিন্ডিকেটের কারসাজি কাজ করছে। চাল দেশেই উৎপাদিত হয়, তাই এর বাজার অস্থির হওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখেন না। ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভর, ফলে দামের তারতম্য হতে পারে। কিন্তু যতটা বাড়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য, দাম বাড়ার জন্য মূল্যস্ফীতির চেয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিই বেশি দায়ী।
তিনি আরও বলেন, দেশে এক ধরনের নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা সরব হয়ে উঠবে। শুধু চাল বা তেল নয়, সার, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, সব খাতই নিয়ন্ত্রণহীন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ এবং কৃষকের সারের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিশ্ববাজারে দাম এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমার পরও দেশে চালের দাম না কমা বলছে, আমদানি ব্যয়, শুল্কনীতি, পরিবহন খরচ ও বাজার কাঠামো মিলিয়ে সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে একাধিক বাধা রয়েছে। এর মধ্যে কোনটি কতটা দায়ী এবং সিন্ডিকেটের ভূমিকা কতটুকু, তা যাচাই করতে স্বচ্ছ তথ্য ও নিয়মিত বাজার তদারকি দরকার। ক্যাবের অভিযোগ যাচাইয়ের দাবি রাখে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয় ও কম কমিশনের কথা বলছেন। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে সত্যটা বেরিয়ে আসতে হলে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে দামের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

