বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তাবাজার, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা জাপানি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করছে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গাড়ি উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো।
জাপান বহির্বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজার নিয়ে জাপানি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রায় ৩৩৮টি জাপানি কোম্পানির মধ্যে ৮৫ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে মত দিয়েছিল। সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রায় ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তারা বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়।
বাংলাদেশে জাপান বহির্বাণিজ্য সংস্থার প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সভাপতি কাজুইকি কাতাওকার মতে, শ্রম ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হওয়ায় অনেক জাপানি কোম্পানি চীন থেকে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম স্থানান্তর করছে।
তিনি জানান, তৈরি পোশাক ও ভোগ্যপণ্য খাতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আগ্রহ বেশি। বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কারণে দেশে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। মিতসুবিশি ও টয়োটার মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশকে ঘিরে জাপানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া জুন বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এবং মুক্ত ও অবাধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ছিল। এসব উদ্যোগের আওতায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিগ-বি পরিকল্পনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে যুক্ত করে একটি শিল্প করিডর গড়ে তোলার ধারণা রয়েছে। জাপানের টোকিও ও ওসাকার শিল্পাঞ্চলের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত এ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটানো।
বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণে কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিশেষ করে মাতারবাড়ী বন্দরকে ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংযোগকারী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতও জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ দেখছে। এ বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি জাপানের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ জাপান ডেস্ক চালু করে।
সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। তবে এ বাজারে রপ্তানি আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে এক ধাপের উৎপত্তিবিধি কার্যকর হলে রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ ও কম ব্যয়বহুল হবে।
বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি করা প্রায় ৯৮ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। গত এক দশকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপানই একমাত্র বাজার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে জাপানে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রয়েছে। ২০১৮ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাপান থেকে লোহা ও ইস্পাত, যানবাহন ও যন্ত্রাংশ, জাহাজ, শিল্পযন্ত্র, খনিজ জ্বালানি, চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম, প্লাস্টিক এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আমদানি করে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোর অনুসৃত ‘চীন প্লাস ওয়ান’ কৌশল দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় অঞ্চলে পরিণত করেছে। প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার, তরুণ কর্মশক্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এ অঞ্চলের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্য, উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতে ৩৫০টিরও বেশি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। মোটরসাইকেল উৎপাদন থেকে শুরু করে পোশাকশিল্প পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে।
দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে। এতে দেশের উৎপাদনশিল্প, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

