মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের আওতায় নীতিভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে এ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। এ ধরনের ঋণ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নীতিগত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাওয়ার আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের জন্য এ প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সফরে প্রতিনিধিদলটি দেশটির সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা মোকাবিলা এবং দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা কমানো। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বাড়তি চাপ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লার আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, সরকারি অর্থব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়।
সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অর্থ বিভাগের প্রস্তাবে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি, পণ্যমূল্যের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিনিময় হারের অনিশ্চয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে তিনটি সংস্কারে গুরুত্ব
প্রস্তাবিত ঋণের অর্থায়নে জ্বালানি খাতের তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে সংস্কার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিনীতি গ্রহণ, সরকারি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ও সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রতিনিধিদলটি দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক কেক্সিমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। দেশটির উন্নয়ন অর্থায়ন কাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার কারণে এ বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এসকে গ্যাসের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ আলোচনায় জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ নাকি প্রস্তাবিত বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা হবে, তা সফরসূচিতে নির্দিষ্ট করা হয়নি।
অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতাও আলোচনায়
জ্বালানি খাতের প্রস্তাবের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি উদ্যোগও খসড়া কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে। এর আওতায় অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প উন্নয়ন, নগরসেবা, ডিজিটাল সমাধান এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হবে।
এদিকে অর্থ বিভাগ দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সহায়তায় আলাদা একটি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও প্রস্তাব করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো।
প্রস্তাবিত সহযোগিতার মধ্যে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর এবং বিশ্লেষণী সরঞ্জামের উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ কর্মসূচির আওতায় আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ঋণের স্থায়িত্ব মূল্যায়ন, মধ্যমেয়াদি ঋণ কৌশল প্রণয়ন, ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা এবং নীতিভিত্তিক ঋণ নিয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষির সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজেট ও রাজস্বসংক্রান্ত পূর্বাভাস আরও কার্যকর হবে, সরকারি ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নত হবে এবং সরকারি ঋণ ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়বে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। ঋণ অনুমোদন, শর্ত নির্ধারণ এবং অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

