টোকিওতে ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বড় একটি বিনিয়োগ প্রত্যাশার কথা এসেছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগ আসতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় নয়, ডলারে হিসাব করলে এর পরিমাণ প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলার। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশাও জানানো হয়েছে।
খবরটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এখানে একটি শব্দ বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। সেটি হলো, ‘পর্যন্ত’। কারণ এটি বিনিয়োগের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অঙ্ক, নিশ্চিত অর্থপ্রাপ্তির ঘোষণা নয়। টাকা এখনো বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি, কারখানাও সব ক্ষেত্রে তৈরি হয়নি। ফলে বড় অঙ্কের ঘোষণাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতিটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এমন গল্প আমরা আগেও শুনেছি
জাপানের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রত্যাশা বাংলাদেশে এবারই প্রথম তৈরি হয়নি। এমন গল্প আমরা আগেও শুনেছি। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখনকার বিনিময়মূল্যে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। সেই অর্থের বড় অংশ ছিল সরকারি ঋণ। এবার ঘোষণার চরিত্র আলাদা। এবারের এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বড় অংশ আসার কথা জাপানি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। সরকার ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু কোনো বেসরকারি কোম্পানি বিদেশে কারখানা স্থাপন করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক হিসাবের ওপর।
অর্থনীতিবিদ জন ডানিংয়ের বহুল আলোচিত তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় যখন তিনটি সুবিধা একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, কোম্পানির এমন প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড বা দক্ষতা থাকতে হয়, যা তাকে প্রতিযোগীদের তুলনায় এগিয়ে রাখে। দ্বিতীয়ত, বিদেশের নির্দিষ্ট দেশে উৎপাদন করলে বাড়তি সুবিধা পেতে হয়, যেমন বড় বাজার, উপযুক্ত অবকাঠামো বা তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। তৃতীয়ত, নিজেই কারখানা পরিচালনা করা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক হতে হয়।
তাই টোকিও চাইলেই কোনো জাপানি কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধ্য করতে পারবে না। সরকার সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোম্পানিকে নিজের লাভ, ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ বাজারের হিসাব কষেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ কারণেই বিনিয়োগের ঘোষণায় ‘পর্যন্ত’ শব্দটিকে সম্ভাবনার সীমা হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত অঙ্ক হিসেবে নয়।
ঘোষিত অঙ্কটি কত বড়, তা বুঝতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গত অর্থবছরে সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল প্রায় ১৪৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে নতুন মূলধন ছিল মাত্র ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের মতো। বাকি অর্থের বড় অংশ এসেছে দেশে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা কোম্পানির মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে।
জাপানের সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ পাঁচ বছরে ভাগ করলে বছরে গড়ে প্রায় ১২৭ কোটি ডলার দাঁড়ায়। অর্থাৎ, অন্য সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশে এক বছরে যত নিট বিদেশি বিনিয়োগ আসে, জাপান থেকে একাই তার কাছাকাছি অঙ্ক পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অবশ্য এই তুলনা পুরোপুরি সমজাতীয় নয়, কারণ ঘোষিত জাপানি বিনিয়োগের মধ্যে অর্থায়নের বিভিন্ন ধরন থাকতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে, অথচ দেশটি থেকে বাংলাদেশের সরাসরি বিনিয়োগ এখনো ৫০ কোটি ডলারের নিচে। ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে বিনিয়োগের অঙ্ক মিলিয়ে আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। আমার হিসাবে, ৬৩৪ কোটি ডলারকে দুই লাখ সম্ভাব্য চাকরি দিয়ে ভাগ করলে প্রতি কর্মসংস্থানের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩২ হাজার ডলার পড়ে। পোশাক কারখানার মতো শ্রমঘন শিল্পে কর্মীপ্রতি বিনিয়োগ সাধারণত এত বেশি হওয়ার কথা নয়। তাই ধারণা করা যায়, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বড় অংশ গাড়ি উৎপাদন ও জ্বালানির মতো মূলধনঘন খাতে যেতে পারে। নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনেও এ ধরনের খাতের সম্ভাবনার কথা এসেছে।
টয়োটা আসছে, কিন্তু জাপানি গাড়ি কেন শুল্কমুক্ত নয়
টয়োটা সুশো করপোরেশনের প্রতিনিধিদল অক্টোবরের শুরুতে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছে, তারা ২০২৭ সালে বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালে সেখানে পূর্ণ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) বাংলাদেশ প্রতিনিধির বরাতে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রয়, সার্ভিস ও যন্ত্রাংশকেন্দ্র স্থাপনে প্রায় চার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ নভেম্বরে শুরু হওয়ার কথা। অন্যদিকে, কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে একটি প্রতিবেদনে গাড়ির কারখানায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে এই অঙ্কের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত বিনিয়োগের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখানে বাংলাদেশের জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। চুক্তিতে জাপানে তৈরি সম্পূর্ণ গাড়িকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি। বাণিজ্য সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে বাংলাদেশের একটি নীতিগত উদ্দেশ্য রয়েছে। জাপানি গাড়ি আমদানির পরিবর্তে দেশেই উৎপাদনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তোলা। বিনিময়ে ইঞ্জিন ও টায়ারের মতো কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক ১৫ বছরে ধাপে ধাপে কমানো হবে।
এটি একধরনের দরকষাকষির কৌশল। বাংলাদেশ চায়, বড় বাজারের সুবিধা পেতে হলে বিদেশি কোম্পানিগুলো শুধু তৈরি পণ্য বিক্রি না করে দেশে উৎপাদন সক্ষমতাও গড়ে তুলুক। ডানিংয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি কোম্পানি যখন বিদেশে বিনিয়োগ করে সেই দেশের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুবিধা নিতে চায়, তখন তাকে বাজারকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বলা হয়। টয়োটার পরিকল্পনা সেই ধরনের বিনিয়োগ।
শুল্কছাড় আছে, তবু জাপানে রপ্তানি বাড়ছে না কেন
এবার বাণিজ্যের কথা। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে রপ্তানি করেছে প্রায় ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করেছে প্রায় ২১৬ কোটি ডলারের। ফারাক প্রায় ৮০ কোটি ডলার, যা আমার হিসাবে। রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে ৩.৬৫ শতাংশ কমেছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ কম।
আরও অবাক করার তথ্য হলো, ১১ বছর ধরে এই রপ্তানি এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই আটকে আছে। অথচ এলডিসি হিসেবে আমরা এখনই জাপানের প্রায় ৯৮ শতাংশ শুল্ক লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই। শিক্ষাটা পরিষ্কার: ছাড় পাওয়া আর বাজার দখল করা এক জিনিস নয়।
জাপানের ক্রেতারা মান, সময়মতো ডেলিভারি আর লিড টাইমে অত্যন্ত কড়া। জাপান বছরে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে, আর আমাদের ভাগ পাঁচ শতাংশের আশপাশে। তবে আশার আলোও আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জাপানে পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ডলার। মোট পোশাক রপ্তানিতে জাপানের অংশ উঠেছে ৩.২৫ শতাংশে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিজিএমইএ জাপানি ব্র্যান্ডের জন্য ১৭২টি কারখানা বেছে নিয়েছে এবং তিন বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য ঠিক করেছে। প্রধানমন্ত্রী ইউনিক্লোর মূল কোম্পানি ফাস্ট রিটেইলিংয়ের প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
তাহলে ইপিএ কী করবে? এটা নতুন ছাড় দেওয়ার চেয়ে বেশি একটা বিমার মতো। চুক্তিতে ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত থাকবে, পণ্য কোথায় তৈরি তা নির্ধারণের নিয়মেও (রুলস অব অরিজিন) পোশাকের জন্য সুবিধাজনক শর্ত আছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রায় এক হাজার জাপানি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে, ১৮ বছর পর্যন্ত ধাপে ধাপে।
নিক্কেইয়ের বরাতে জানা যায়, চুক্তিটি ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে কার্যকর হওয়ার কথা, তবে দুই দেশের সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে। সময়সূচিটা এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ জুলাইয়ে বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠিয়েছে। আমি যতটুকু দেখেছি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর এখনো পাইনি। সিদ্ধান্ত যেটাই হোক, ইপিএ কার্যকর হওয়ার আগে কোনো ফাঁক যেন না থাকে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
কারখানা চালাতে বিদ্যুৎ থাকবে তো?
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে জ্বালানি সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাপানের ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের প্রশংসা করেছেন। এটি জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ কর্মসূচির আওতায় প্রথম ইয়েন ঋণ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগকারীদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ শুধু কূটনৈতিক বৈঠকে তৈরি হয় না। কারখানা বসানোর আগে বিনিয়োগকারীকে নিশ্চিত হতে হয়, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, উৎপাদন নিয়মিত চালানো যাবে কি না এবং পণ্য সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না। যৌথ বিবৃতি প্রকাশের দিনই মেঘনাঘাটে বিদ্যুৎ গ্রিডের সমস্যার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর আসে। এ ধরনের ঘটনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নটি আবারও তুলে ধরে।
জেট্রোর ২০২৫ সালের এক জরিপে বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশ আগামী এক থেকে দুই বছরে ব্যবসা সম্প্রসারণের ইচ্ছা জানিয়েছিল। অন্যদিকে, প্রায় ৯৪ শতাংশ কোম্পানি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখেছে। করসংক্রান্ত প্রক্রিয়ার ধীরগতি, নীতির অসংগতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অবশ্য জরিপটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগের। তারপরও এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহ রয়েছে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বাস্তব পরিবর্তন দেখাতে হবে।
মাতারবাড়ির জমি, নদী আর মানুষের প্রশ্ন
জাপান বাংলাদেশ সহযোগিতার একটি বড় কেন্দ্র হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’, সংক্ষেপে বিগ বি। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে এখন ‘বিগ বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো একসঙ্গে উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মাতারবাড়ি।
মাতারবাড়ির ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৩ সালে চালু হয়েছে। জাইকার মতে, প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। মহেশখালী ও মাতারবাড়ির মহাপরিকল্পনায় প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমি এবং ১৩ গিগাওয়াট এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামোর কথা রয়েছে।
কিন্তু বড় অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও পরিবেশের প্রশ্নটিও জড়িয়ে আছে। অ্যাকশনএইডের ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপেই প্রায় ২০ হাজার মানুষ উচ্ছেদের মুখে পড়েছিলেন। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মংগাবের এক প্রতিবেদনে স্থানীয় নেতাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান দেওয়ার কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে জাইকা ২০২২ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ধাপে অর্থায়ন বাতিল করেছিল।
নতুন যৌথ বিবৃতিতে কয়লাভিত্তিক সম্প্রসারণের বদলে দীর্ঘমেয়াদি কম নির্গমন কৌশল, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু সহযোগিতার সমঝোতা স্মারকের কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক। তবে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশ ও মানুষের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পায় তার ওপর।
আইনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী, শিল্প প্রকল্পকে সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লাল শ্রেণির প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ বাধ্যতামূলক। জাতিসংঘের রিও ঘোষণার কয়েকটি নীতিও এখানে প্রাসঙ্গিক। বড় প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে, দূষণের খরচ দূষণকারীকে বহন করতে হবে এবং ঝুঁকি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমি শিল্পায়নের বিরোধী নই। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু বিনিয়োগের খরচ যদি শেষ পর্যন্ত উপকূলের জেলে, লবণচাষি কিংবা স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর পড়ে, তাহলে সেই হিসাবও উন্নয়নের পরিকল্পনায় থাকতে হবে। জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত প্রভাব ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব দুটোই বাড়তে পারে।
ঘোষণা থেকে কারখানা পর্যন্ত যেতে করণীয়
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ঘোষণাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া। প্রথমত, ইপিএ কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সূচির সঙ্গে চুক্তির বাস্তবায়নও মিলিয়ে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের জন্য কর, শুল্কায়ন, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসন এবং লাইসেন্সিংয়ের নিয়ম সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরত নেওয়ার অনুমোদনসীমা ৮ লাখ ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮১ লাখ ৩০ হাজার ডলার করেছে।
তৃতীয়ত, আরাইহাজারে সুমিতোমোর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জাপানি বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনব্যবস্থা চান। সেখানে কারখানা স্থাপনের পর নিয়মিত জ্বালানি পাওয়া না গেলে উচ্চমানের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
চতুর্থত, সম্ভাব্য দুই লাখ কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে জাপানি ভাষা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগ থেকে দেশের মানুষ কতটা উপকৃত হবেন, তা নির্ভর করবে স্থানীয় কর্মীদের কতজন দক্ষ ও মানসম্মত চাকরিতে যুক্ত হতে পারেন তার ওপর।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের সাধারণ পণ্যের বাইরে গিয়ে বিশেষায়িত পোশাক, উন্নতমানের পণ্য এবং জাপানি ব্র্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, পণ্যের মূল্য সংযোজনও বাড়তে পারে।
ষষ্ঠত, মাতারবাড়ির মতো বড় প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সপ্তমত, ঘোষিত বিনিয়োগ ও বাস্তবে আসা বিনিয়োগের হিসাব আলাদা রাখতে হবে। কারণ বিনিয়োগের মোট অঙ্ক বাড়লেই যে নতুন মূলধন বা নতুন কারখানা সমান হারে বাড়ছে, তা নয়।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ শতাংশ বেড়েছিল বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, আর বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছিল পুনর্বিনিয়োগ ও কোম্পানির ঋণ থেকে। ফলে বিনিয়োগের সাফল্য পরিমাপ করতে শুধু মোট অঙ্ক নয়, নতুন মূলধন, নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতার পরিবর্তনও দেখতে হবে।
এখন সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা রয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে টয়োটার সার্ভিস কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালে ইপিএ কার্যকর করা এবং টয়োটার গাড়ির কারখানার কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৯ সালে কারখানাটির পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার কথা। জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ও অর্থনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের দরজা খুলেছে মাত্র। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন নীতি ও অবকাঠামোর উন্নতি, দক্ষ জনবল, ব্যবসায়িক পরিবেশের সংস্কার এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা। পাঁচ বছর পর এই উদ্যোগের সাফল্য মাপতে তিনটি প্রশ্ন করা যাবে। কতগুলো নতুন কারখানা তৈরি হলো, কতজন মানুষ স্থায়ী কর্মসংস্থান পেলেন এবং প্রকল্প এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা কতটা উন্নত হলো। এই তিনটি প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেলে তবেই ঘোষণাটি বাস্তব অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ নেবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

