একসময় বৃহত্তর খুলনার বাড়ির আঙিনায় শখে লাগানো চুইঝাল এখন বড় আকারের বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চুইঝালের উৎপাদন ৬০০ টনের বেশি হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর উৎপাদন ছিল ২৩৮ টন। অর্থাৎ ছয় বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
কেজিপ্রতি গড় দাম ১ হাজার ২০০ টাকা ধরলে দেশে চুইঝালের বাজারের আকার ৭০ কোটি টাকার বেশি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি হিসাবের বাইরেও চাষ ও বিক্রি হয়। তাই প্রকৃত বাজার প্রায় শতকোটি টাকার, কারও কারও ধারণায় তার চেয়েও বেশি।
খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে অন্তত ১০টি দোকান শুধু চুইঝাল বিক্রি করে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এই বাজারে প্রতিদিন এক হাজার কেজির বেশি চুইঝাল বিক্রি হয়। এর বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে কেজি ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম নির্ভর করে মানের ওপর।
ব্যবসায়ীরা জানান, তিন বছর আগেও চাষির কাছ থেকে ভালো মানের চুই ৮০০ টাকা কেজিতে কেনা যেত। এখন তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। একসময় চাষিরা এই চুই কেজিপ্রতি মাত্র ২ টাকায়ও বিক্রি করতেন বলে জানান তারা।
দাম ও চাহিদা বাড়ায় কৃষকের আগ্রহও বেড়েছে। আম, কাঁঠাল বা মেহগনি বাগানে সাথি ফসল হিসেবে চুইয়ের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ছে। খুলনার নার্সারিগুলোতে চারা বিক্রি কয়েক বছরে ২-৩ হাজার থেকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। চাষ এখন বৃহত্তর খুলনার বাইরেও ছড়িয়েছে। কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহে বাণিজ্যিকভাবে চুইয়ের আবাদ হচ্ছে। সিরাজগঞ্জেও বিদেশফেরত এক ব্যক্তি সফলভাবে চাষ করে আলোচনায় এসেছেন।
চুইঝাল মরিচজাতীয় কোনো উদ্ভিদ নয়। এটি পানের নিকটাত্মীয়। পর্তুগিজদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে মরিচ আসার আগে রান্নায় ঝাঁজ আনতে যেসব স্থানীয় মসলা ব্যবহৃত হতো, চুইঝাল তার অন্যতম। একসময় অবিভক্ত বাংলার রান্নায় এর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। পরে তা কেবল বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলের বসতবাড়ির আঙিনায় টিকে ছিল। গরু, খাসি ও হাঁসের মাংস রান্নায় এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। লোকচিকিৎসায় গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য, সর্দি-কাশি ও হজমের সমস্যায়ও এটি ব্যবহৃত হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালের একাধিক গবেষণায় চুইয়ের নির্যাসে জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ক্যানসার-কোষ প্রতিরোধী উপাদানের প্রমাণ মিলেছে।
বড় বাজারসংলগ্ন খাবার হোটেলগুলোতে চুইঝালের স্বাদ নিতে ভিড় করেন ভোজনরসিকেরা। রেলস্টেশনের কাছের ‘হোটেল জাবেদ’-এ চুই দিয়ে রান্না করা গরুর মাংসের কদর বেশি। হোটেলটিতে প্রতিদিন দুপুরে দেড় থেকে দুই মণ চুই-মাংস বিক্রি হয়। খেতে বসতে ক্রেতাদের রীতিমতো লাইনে দাঁড়াতে হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালে সম্ভাব্য যে ১৫১টি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের তালিকা তৈরি করেছে, তাতে খুলনার চুইঝাল রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পেলে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: প্রথম আলো

