বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাতের প্রকল্পে সহায়তা দিতে ১০টি খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, সংক্ষেপে সাবিনকো। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন নির্ভর করছে দুই দেশের সরকারের নতুন ইক্যুইটি জোগানের ওপর। বাংলাদেশ সরকার নীতিগতভাবে সম্মতি দিলেও সৌদি আরব এখনো তাদের অংশ দিতে রাজি হয়নি।
বাংলাদেশ সরকার সাবিনকোতে নতুন সার্বভৌম ইক্যুইটি হিসেবে ১০০ মিলিয়ন ডলার জোগান দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ঃ৫০ মালিকানা কাঠামো ধরে রাখতে ঢাকা সৌদি আরবের কাছেও সমপরিমাণ অর্থ চেয়েছে। গত ৭ অক্টোবর পাঠানো এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-জাদানকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। দুই দেশের সরকার সম্মত হলে সাবিনকোর পরিশোধিত মূলধন ৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৬০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
সাবিনকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মারুফ উর রহমান মজুমদার জানান, প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেছে। এখন জ্বালানি, ওষুধ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে সেই বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা নীতিগতভাবে একমত। দুই দেশের সরকার নতুন মূলধন জোগালে বিনিয়োগ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
সাবিনকোর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের কৌশলপত্র অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে। এখানে সম্ভাব্য বরাদ্দ ৪০ মিলিয়ন ডলার, যা মূলত বড় আকারের ও ক্যাপটিভ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যয় হবে। পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু অর্থায়নের জন্য আরও ২০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় বর্জ্য শোধনাগার, জিরো-লিকুইড-ডিসচার্জ স্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় ও শিল্পকারখানা আধুনিকায়নের প্রকল্প থাকবে।
ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল, অর্থাৎ অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট খাতে ৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্যশিল্পের জন্য রাখা হয়েছে আরও ৩০ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থ শস্য সংরক্ষণ, ডেইরি, পোলট্রি, মৎস্য ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামোতে যাবে। বাকি ৮০ মিলিয়ন ডলার অন্য কয়েকটি খাতে ভাগ করা হবে। এর মধ্যে ইভি ও ব্যাটারিতে ১৬ মিলিয়ন, ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টরে ১৬ মিলিয়ন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোতে ১৪ মিলিয়ন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২ মিলিয়ন, পাট ও বহুমুখী পণ্যে ১২ মিলিয়ন এবং কাগজ, প্যাকেজিং ও রিসাইক্লিংয়ে ১০ মিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে।
তবে এসব বরাদ্দ প্রাথমিক হিসাব মাত্র। মূলধন যাচাই, ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রকল্প বাছাই করা হবে। শিল্প খাতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার কারণে কৌশলপত্রে সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওষুধ খাতের অর্থায়ন দেশে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে এবং সৌদি কোম্পানির পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারত্ব গড়তে সহায়তা করবে।
অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও উৎপাদনমুখী শিল্পে সৌদি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। কৌশলপত্রে প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলো সৌদি ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে সাবিনকোকে সৌদি কোম্পানির জন্য স্থানীয় অর্থায়ন ও যৌথ বিনিয়োগের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আকওয়া পাওয়ার, খাদ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যে আলমারাই এবং শিল্প উৎপাদনে সাবিকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজের সম্ভাব্য ক্ষেত্রও চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাবিনকো আশা করছে, প্রস্তাবিত ২০০ মিলিয়ন ডলারের নতুন মূলধন যুক্ত হলে বহুজাতিক ও আরব উন্নয়ন সংস্থা থেকে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণ সংগ্রহ সম্ভব হবে। দুই দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি যৌথ সার্বভৌম গ্যারান্টি বা কাউন্টার-গ্যারান্টি কাঠামো গড়ার প্রস্তাবও কৌশলপত্রে রয়েছে।
কৌশলগত পরিকল্পনার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাবিনকোর মোট সম্পদ ১ হাজার ১৪ দশমিক ২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে কর-পরবর্তী বার্ষিক নিট মুনাফা ৩৭ দশমিক ৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রাক্কলন, নিশ্চিত ফলাফল নয়। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দুই কিস্তিতে নতুন ইক্যুইটি পাওয়া যাবে, এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উভয় সরকারকে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার করে জোগান দিতে হবে। কর-পরবর্তী বার্ষিক নিট মুনাফার ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের প্রস্তাব করেছে কোম্পানিটি, যা দুই সরকারের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বার্ষিক লভ্যাংশ ৭০ দশমিক ৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যাতে প্রতিটি দেশের সরকার পাবে প্রায় ৩৫ দশমিক ২ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে সাবিনকোর এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পুরোপুরি নির্ভর করছে সৌদি আরবের সমপরিমাণ মূলধন জোগানে সম্মতি, অর্থ ছাড়ের সময় এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতার ওপর। বিনিয়োগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখতে হবে। সৌদি সম্মতি মিললে এটি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের বিদেশি সহযোগিতার দরজা খুলে দিতে পারে।

