চট্টগ্রাম বন্দর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্দরে এবং বেসরকারি ডিপোতে প্রায় ৫১ হাজার আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকা পড়েছে। এর ফলে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্য গভীর সংকটে পড়েছে। এছাড়া আসন্ন রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।
শ্রমিকরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে টার্মিনালের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আট ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করেন। গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হয়। মঙ্গলবার থেকে এই কর্মবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
কর্মবিরতির কারণে বন্দরের ভেতরে কোনো অপারেশনাল কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেলগুলো আমদানিকৃত পণ্য খালাস করতে পারছে না। কনটেইনারবাহী জাহাজও বন্দরে বার্থিং নিতে পারছে না। রপ্তানির কনটেইনার জাহাজীকরণও বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার জট তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের অভাবে ভোগ্যপণ্যসহ নানান বাল্ক পণ্যও বহির্নোঙরে আটকে আছে।
বন্দর সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ও বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো কনটেইনার ডেলিভারি হয়নি। একই সময়ে কোনো কনটেইনার জাহাজীকরণও হয়নি, যা দেশের আমদানি-রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের গত সোমবারের (২ ফেব্রুয়ারি) তথ্য অনুযায়ী, বন্দরে ৯৮টি জাহাজ অবস্থান করছিল। এর মধ্যে জেটিতে ছিল ১৭টি, আর বহির্নোঙরে ৮১টি। বহির্নোঙরে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে ৫৩টিতে পণ্য খালাস চলছিল, ২৮টি জাহাজ খালাসের অপেক্ষমান। বন্দর অভ্যন্তরে কনটেইনারের পরিমাণ ছিল ৩৭,৩০৭ টিইইউ।
কিন্তু বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বন্দরের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় কোনো কনটেইনার আনা নেওয়া হয়নি, ডেলিভারি হয়নি এবং জাহাজীকরণও হয়নি। এদিন বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ৩৭,৩১২ টিইইউ। এর মধ্যে এফসিএল (ফুল লোডেড কনটেইনার) ২৯,৯০৪ টিইইউ, বেসরকারি ডিপোগামী ১,৪১৮ টিইইউ, এলসিএল কনটেইনার ১,০৩৮ টিইইউ এবং আইসিডি গামী ১,৭৬৯ টিইইউ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কনটেইনার বন্দরের ভেতরে আটকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বুধবার রাতে জানান, “বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় দেখছে। সম্ভবত বৃহস্পতিবার কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।” এদিন বহির্নোঙরে ৭৯টি জাহাজ পণ্য খালাসমান ছিল।
বেসরকারি ডিপোগুলোতে ১৯ হাজার কনটেইনার স্থবির অবস্থায় রয়েছে:
বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)-এর মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব জানিয়েছেন, বন্দরে অপারেশন বন্ধ থাকায় রপ্তানি কনটেইনার পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে ডিপোগুলোতে আমদানি পণ্য খালাস হচ্ছে, আর রপ্তানির পণ্য বন্দরে নামিয়ে স্টাপিং করে রাখা হচ্ছে।
গত তিন দিনের মধ্যে রপ্তানির কনটেইনারের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার বেড়েছে। বর্তমানে বিকডার ১৯টি ডিপোতে রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ১১ হাজার, আমদানির কনটেইনার আট হাজার এবং খালি কনটেইনার ৫২ হাজার। এর অর্থ, বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনে রপ্তানি পণ্যের জট আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বন্দরে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকলে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের সরবরাহ চেইন গুরুতরভাবে বিঘ্নিত হবে। রপ্তানি পণ্যের আটকে থাকা কনটেইনার দেশের বিদেশী বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করবে, যা ব্যবসায়িক ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি পণ্যের খালাসে বিলম্ব ভোক্তা বাজারে সরবরাহ চেইন ধীর করে দেবে।
এ পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, বন্দর কার্যক্রম ও শ্রমিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কার্যক্রম শুরু না হলে রপ্তানি-আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই জট ও আর্থিক ক্ষতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ:
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘতের কারণে অপারেশনাল কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় আমদানিকারকরা বহির্নোঙর থেকে পণ্য খালাস করতে পারছেন না। বন্দরে আটকা পড়া কনটেইনারের সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজারে পৌঁছেছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত পরিচালক শফিউল আলম জানান, “বন্দরের দাপ্তরিক কাজ বন্ধ থাকায় পণ্য খালাসের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। ডকুমেন্ট প্রস্তুত না থাকার কারণে গত চার দিনে অন্তত ৩৬টি মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হয়নি।”
দীর্ঘ সময় বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে দেশের আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বাল্ক পণ্যের খালাস বিলম্বিত হলে ভোক্তা বাজারে সরবরাহ কমে যাবে এবং রপ্তানি পণ্যের জট দেশের ব্যবসায়িক চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভোগ্যপণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে:
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘতের কারণে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির থাকায় আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের খালাস ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে দেশের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইনও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ, যা দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি ভোগ্যপণ্য বাজার, সেখানকার ব্যবসায়ীরা এর প্রভাব সরাসরি অনুভব করছেন।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জানান, “আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই রোজা শুরু হবে। রমজান মাসে ছোলা, ডাল, খেজুর, চিনি ও তেলের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু বন্দরে কাজ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজ থেকে ছোলা, মশুর ও মটর ডাল খালাস অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০০ জাহাজে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে পারে। এটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের উচিত আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্ট সংকট দ্রুত সমাধান করা।”
বন্দরে দীর্ঘ সময় অপারেশন বন্ধ থাকলে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, ভোক্তাদের পণ্যের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়বে। রমজান মাসে সরবরাহের বিলম্বে মূল্যবৃদ্ধি বাড়তে পারে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার উপরও চাপ তৈরি হবে।
বড় ক্ষতির মুখে পোশাকশিল্প মালিকরা:
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘতের কারণে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। দেশের বড় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এশিয়ান গ্রুপের মালিকানাধীন গার্মেন্টসগুলোর চলতি সপ্তাহে ৬০ কোটি টাকার বেশি তৈরি পোশাক জাহাজীকরণ হয়নি। একই সঙ্গে আমদানিপণ্য, বিশেষ করে পোশাকশিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালও খালাসে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ সালাম জানিয়েছেন, “আমরা ব্যবসায়ীরা চোখে অন্ধকার দেখছি। আমাদের গার্মেন্টসগুলোতে দৈনিক ১২ কোটি টাকার পোশাক তৈরি হয়। চলতি সপ্তাহের পুরো সময় বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘতের কারণে অপারেশন বন্ধ ছিল। দুইটি কনসাইনমেন্ট শিপমেন্ট হয়নি। আমদানিকৃত কাঁচামালও খালাস নেওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশের কারখানাগুলো একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।”
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একজন উপদেষ্টা জানান, “নির্বাচনকে ঘিরে তিন দিনের সাধারণ ছুটি থাকবে, যার কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে গার্মেন্টসগুলো মাত্র ১৮ দিন কার্যক্রম চালাতে পারবে। মার্চেও কাজ চলবে ১৬-১৭ দিন। এর পাশাপাশি বন্দর যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে, চলতি শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যাবে এবং আগাম কাঁচামালও সময়মতো আসবে না। ফেব্রুয়ারির ১১ থেকে ১৬ পর্যন্ত চীনের সঙ্গে কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। সময় এখন বড় ফ্যাক্টর, ব্যবসায়ীরা বিপুল ক্ষতির মুখে আছেন।”

এমএ সালাম আরও বলেন, “আগে বন্দরে আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু কখনো জাহাজ অপারেশন বন্ধ ছিল না। এবার জাহাজও বন্ধ রয়েছে। এতে বিদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেসব কনটেইনার বন্দরে আটকে আছে, সেগুলোতে ডেমারেজ আরোপ হবে, যা ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে যাবে।”
তিনি সতর্ক করেছেন, “আর এক সপ্তাহ পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দুই সপ্তাহ পরে রমজান শুরু হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। বন্দর অচল হয়ে গেলে পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প স্থবির হয়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্য ও জীবনমানে। এনসিটি নিয়ে চলমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে সামনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।”
বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘট এবং অপারেশন বন্ধ থাকার কারণে দেশের অর্থনীতি, গার্মেন্টস শিল্প এবং ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে রপ্তানি শিপমেন্ট বন্ধ থাকা এবং কাঁচামালের বিলম্ব আগামী মাসে উৎপাদন ও বাজার মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত সমাধান না হলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক রূপ নেবে।
কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে:
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের টানা ধর্মঘতের কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শনি-সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা এবং মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টানা কর্মবিরতির প্রভাবে বন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে কোনো কার্যক্রম সম্ভব হচ্ছে না।
গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিক দল নেতা মো. ইব্রাহিম খোকন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। এ বিষয়ে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা মো. হুমায়ুন কবীর জানান, “সরকার যতক্ষণ ইজারা প্রক্রিয়া থেকে ফিরে আসবে না, ততক্ষণ কর্মসূচি চলবে। বন্দরের সর্বস্তরের কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে সাড়া দিয়েছেন।”
অন্যদিকে আন্দোলনে জড়িত অন্তত ১৬ জন কর্মচারীকে প্রথমে ঢাকার পানগাঁও আইসিটি ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করা হয়। পরে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় তাদের মংলা ও পায়রা বন্দরে শাস্তিমূলক বদলি করলেও, তারা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দেননি।

