সংসদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন বা বাতিল না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং পুলিশ কমিশন গঠনের অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ না থাকা অবস্থায় জারি করা অধ্যাদেশ প্রথম বৈঠকে উত্থাপন বাধ্যতামূলক। এরপর ৩০ দিনের মধ্যে তা অনুমোদন বা বাতিল করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে প্রয়োজনে হেফাজতকরণ ব্যবস্থা রেখে রহিতকরণ বিল আনার সুযোগ থাকে কিন্তু সংসদে অনুমোদন বা রহিতকরণ কোনোটিই না হওয়ায় অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
গত ১২ মার্চ মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে আলোচিত এই ১৩টি অধ্যাদেশও ছিল। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও শুক্রবার পর্যন্ত এগুলোর বিষয়ে কোনো অনুমোদন বা অননুমোদনের বিল সংসদে আনা হয়নি।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা গণভোট অনুযায়ী গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১–দলীয় নির্বাচনী জোটের সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে এবং এর ভিত্তিতেই গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়। পরবর্তীতে গণভোট আয়োজনের জন্য আলাদা ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। এ বিষয়ে বিএনপি শুরু থেকেই অবস্থান জানিয়ে আসছে যে, সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, তবে সংবিধান সংশোধনের আদেশ জারির সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ৩১ মার্চ সংসদে দাঁড়িয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-কে অন্তর্বর্তী সরকারের “অন্তহীন প্রতারণার দলিল” এবং “জাতীয় প্রতারণা” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন, এই আদেশের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এটি শুরু থেকেই অবৈধ।
সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় গণভোট অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারির ভিত্তি হলো জুলাই গণ–অভ্যুত্থান এবং জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা।
সংসদীয় কার্যক্রমে দেখা যায়, শুক্রবার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা–সম্পর্কিত তিনটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি এবং সংসদ সচিবালয়–সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশসহ মোট সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাল।
একই সঙ্গে সংসদে এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে। রহিতকরণসহ অধ্যাদেশ–সম্পর্কিত মোট ৯১টি বিল পাস হয়েছে বলেও জানা গেছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় যেসব অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে গেছে, তার মধ্যে রয়েছে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব।
অন্যদিকে পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ থাকলেও শুক্রবার পর্যন্ত এটি অনুমোদনের জন্য সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে এ উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়া এবং কিছু বিল বাতিলের ফলে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন আইনি কাঠামোর পরিবর্তন ঘটছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিতর্কও আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
শেষ দিনে পাস হলো ২৪টি বিল:
অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদনের শেষ দিন থাকায় শুক্রবার সরকারি ছুটির মধ্যেও সংসদের কার্যক্রম চলেছে সকাল ও বিকেল—দুই পর্বে। দিনভর ব্যস্ত এই বৈঠকে মোট ২৪টি বিল পাস করা হয়।
পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কাঠামো–সংক্রান্ত উদ্যোগ। এর মধ্যে আছে নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল। পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন বিল এবং বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল।
অর্থনৈতিক খাতে পাস হয়েছে আমানত সুরক্ষা বিল, দ্য এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) বিল, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ব্যাংক রেজোল্যুশন বিল এবং অর্থ (২০২৫-২৬ অর্থবছর) বিল।
শিক্ষা ও প্রশাসনিক খাতে পাস হয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল। ডিজিটাল ও তথ্য ব্যবস্থাপনা খাতে রয়েছে জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল এবং সাইবার সুরক্ষা বিল।
এছাড়া মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংরক্ষণ) বিল এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিলও ওই দিনে পাস হয়। একই সঙ্গে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলও অনুমোদন পায়।
সব মিলিয়ে শেষ দিনের এই ব্যস্ত আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে একদিকে যেমন বহু বিলের নিষ্পত্তি হয়েছে, অন্যদিকে সংসদীয় সময়সীমার চাপও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

