মামলা করার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন—এখন কীভাবে মামলা তুলে নেবেন? ক্ষতিপূরণ পাওয়া, আপোষ মীমাংসা, ক্ষমা কিংবা ভুলবশত দায়ের—বিভিন্ন কারণে এই প্রশ্ন সামনে আসে। আইন বলছে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ফৌজদারি ব্যবস্থায় মামলা প্রধানত দুই ধরনের—জি.আর (জেনারেল রেজিস্টার) এবং সি.আর (কমপ্লেইন রেজিস্টার)। জি.আর মামলা হয় থানায়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজেই বাদীর পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে, যাদের বলা হয় পাবলিক প্রসিকিউটর বা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পি.পি)। অন্যদিকে সি.আর মামলা সরাসরি আদালতে দায়ের করা হয়। এখানে বাদীকেই ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনা করতে হয়।
থানায় দায়ের করা জি.আর মামলার ক্ষেত্রে, যদি আপোষ হয় বা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারায় আদালতের অনুমতি নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অভিযোগ গঠনের পর বাদী ও অন্যান্য সাক্ষী আদালতে আপোষের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিয়ে আসামির খালাসের পথ তৈরি করতে পারেন। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়।
তবে কোনো ক্ষেত্রে যদি ভুক্তভোগী মনে করেন যে রাষ্ট্রপক্ষ অযৌক্তিকভাবে মামলা প্রত্যাহার করেছে, তাহলে দায়রা জজ আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন আবেদন করে প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
সি.আর মামলার ক্ষেত্রে, বাদী বা তাঁর আইনজীবী ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৮ ধারায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন। তবে এটি কেবল সেইসব মামলায় প্রযোজ্য, যেগুলো আপোষযোগ্য—যা ৩৪৫ ধারায় উল্লেখ রয়েছে। এখানেও আদালত আবেদন নাকচ করলে, অভিযোগ গঠনের পর আপোষমূলক সাক্ষ্য দিয়ে আসামির খালাস নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে।
অন্যদিকে দেওয়ানি বা জমিজমা সংক্রান্ত মামলায়, বাদী যে কোনো সময় পুরো বা আংশিক দাবি প্রত্যাহার করতে পারেন। দেওয়ানি কার্যবিধির ২৩ আদেশের ১ নিয়মে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে। তবে আদালতকে সন্তুষ্ট করা এখানে অপরিহার্য।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, একবার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মামলা প্রত্যাহার করলে একই বিষয়ে নতুন করে মামলা করা যায় না। দেওয়ানি মামলায় ‘রেস জুডিকাটা’ এবং ফৌজদারি মামলায় ‘ডাবল জিওপারডি’ নীতির কারণে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে উচ্চতর আদালতে রিভিশন করে যদি আদালতকে সন্তুষ্ট করা যায়, তাহলে পুনর্বিচার বা পুনর্তদন্তের নির্দেশ আসতে পারে। বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগের সহজাত ক্ষমতার আওতায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
- লেখক: সিরাজ প্রামাণিক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

