“আয় বুঝে ব্যয় করো”—এই প্রচলিত নীতির বিপরীত পথে হাঁটছে সরকার। আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, সেখানে আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি ধরা হয়েছে। শুধু আয় নয়, দেশের বর্তমান সক্ষমতার তুলনাতেও ব্যয়ের পরিমাণ অনেকটা বেশি রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে। তাদের মতে, এত বড় ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে নিয়মিত করদাতাদের ওপর। দেশে কর জালের পরিধি এখনও সীমিত হওয়ায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ের চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সেই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে বাজেট প্রস্তাবে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুললেই ভ্যাট শনাক্তকরণ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত করের সর্বোচ্চ হার ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এতে করের চাপ আরও বেড়ে যাবে। তারা বলছেন, করপোরেট কর কমানো হয়নি, যা ব্যবসা খাতের জন্য একটি বড় ঘাটতি। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসা পরিবেশ এখনো পুরোপুরি অনুকূলে নয়। তাই করপোরেট কর হ্রাস করা জরুরি ছিল, যা বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। সেখানে অর্থমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী মহল।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যদিও ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়েছে, তবুও রাজস্ব আয় প্রত্যাশিতভাবে না বাড়লে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে। তাদের মতে, বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির নিশ্চয়তাও নেই। প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার না হলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা কমে যেতে পারে।
তারা আরও জানান, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কথা বলা হলেও বিদ্যমান শিল্প খাত সুরক্ষায় কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। পাশাপাশি কর কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সে বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার শেষ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
প্রস্তাবিত ৫৫তম বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর, ভ্যাট ও শুল্ক থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান কর কাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় অনেক অর্থনীতিবিদও এই লক্ষ্যমাত্রাকে চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন। তাদের মতে, নির্ধারিত রাজস্ব অর্জন করতে হলে কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। বছর শেষে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। কর জালের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ালে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তখন সীমিত করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জনে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমান। তার মতে, রাজস্ব আদায়ের উচ্চ ও বাস্তবতা বিবর্জিত লক্ষ্য এবং ক্রমবর্ধমান ঘাটতি অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বাজেটে প্রস্তাবিত ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেশন সিস্টেম, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লাইসেন্স প্রদান এবং অগ্রিম কর সমন্বয়ের সুযোগ ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জনকে তিনি অবাস্তব মনে করছেন।
ঢাকা ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের অর্থ সংগ্রহের চাপ ইতোমধ্যে খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর পড়েছে। তার মতে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি হাজারে ২ টাকা কর আরোপের ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান মনে করেন, কর কাঠামোর মৌলিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইর নেতারাও মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তারা বলছেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর ব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।
অন্যদিকে, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য গতি প্রয়োজন। বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকটের কারণে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) সাবেক চেয়ারম্যান এস আহমেদ মজুমদার বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা এখনো বিদ্যমান। তার মতে, দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ কমছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আগে দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচন জরুরি। তাদের মতে, অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয় কমানো সম্ভব হলে অর্থনৈতিক চাপ অনেকটা কমে আসতে পারে। ই-কমার্স খাতের জন্য বাজেটে আলাদা কোনো বড় উদ্যোগ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, এই খাতটি বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, ই-কমার্স উদ্যোক্তারা উচ্চ লজিস্টিক খরচ, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং সহায়তার ঘাটতির মতো সমস্যার মুখোমুখি। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছেন না, যা খাতটির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তাব, বিদেশি ঋণের সুদে উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা এবং উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য ব্যয়ের বিধান বাতিল—এসব উদ্যোগ বিনিয়োগ পরিবেশকে সহজ করতে পারে।
তৈরি পোশাক খাতের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। নতুন বাজেটে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, সময়মতো কর সমন্বয় বা ফেরত না হলে কার্যকর মূলধন আটকে যায়, যার ফলে তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং শিল্প খাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। তবে ফেরত ব্যবস্থার আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
রপ্তানিমুখী শিল্পের বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, নীতিগত ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা পরিকল্পনায় সহায়তা করবে।
এছাড়া স্টার্টআপ খাতে আলাদা তহবিল বরাদ্দ এবং কর সুবিধার প্রস্তাবকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতিও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করেছে।

