২৫ বছর আগের ভয়াবহ রমনা বটমূল বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ এই বিচারিক অগ্রগতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলেও আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের ধাপেই আটকে আছে কার্যক্রম। ফলে ৪ বছর ধরে কার্যত থমকে আছে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া।
হত্যা মামলার রায় হলেও ঝুলে আছে বিস্ফোরক মামলা:
২০০১ সালের ১ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের সকালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে দুটি বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়—একটি হত্যা মামলা এবং আরেকটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা।
পরবর্তীতে হত্যা মামলার বিচার শেষ হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। ওই রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে একই ঘটনার বিস্ফোরক মামলার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
বিচার চলছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে:
বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এ বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে কারাগারে থাকা একাধিক আসামিকে হাজির করা সম্ভব না হওয়ায় শুনানি হয়নি। পরে আদালত নতুন করে আগামী ৯ জুলাই আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন নির্ধারণ করে।
আদালত সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২১ মার্চ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয় ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ। এরপর ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল সাতজন আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। একই সঙ্গে তারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। তবে অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় ওই ধাপে অংশ নিতে পারেননি।
পরবর্তীতে ২৮ জুলাই ২০২২ মামলাটি ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি তা পাঠানো হয় ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এ। সেই থেকে মামলাটি এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের ধাপেই রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বলেন, কারাগারে থাকা সাত আসামি বিভিন্ন মামলায় দেশের বাইরে বিভিন্ন কারাগারে থাকায় আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানির জন্য আসামিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই ধাপটি এগোচ্ছে না। তিনি জানান, আসামিদের আদালতে হাজির করা গেলে দ্রুত শুনানি শেষ করা সম্ভব হবে এবং মামলার নিষ্পত্তিও দ্রুত হবে।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য:
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হলেও বিস্ফোরক মামলায় দীর্ঘ সময় লেগেছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশসহ নানা কারণে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মামলাটি আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যায়ে রয়েছে। এই ধাপ শেষ হলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। তার আশা, আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যেই অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিন দাবি করেন, মামলাটি ভিত্তিহীন এবং এক ব্যক্তির জোরপূর্বক জবানবন্দির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। তার ভাষ্য, আসামিরা এই ঘটনায় সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং সঠিক বিচার হলে তারা খালাস পাবেন।
ঘটনার পটভূমি:
২০০১ সালের পহেলা বৈশাখের সকালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ চলাকালে ৮টা ৫ মিনিটে প্রথম বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক মুহূর্ত পর আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষ। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঘটনার দিনই নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। পরে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আবু হেনা মো. ইউসুফ মোট ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার শেষে ২০১৪ সালে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি বিভিন্ন ধাপে আদালত পরিবর্তন, শুনানির জটিলতা এবং আসামি অনুপস্থিতির কারণে এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি। বর্তমানে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের ধাপ শেষ হলে দ্রুত মামলাটি রায়ের দিকে এগোবে।
নিহতদের তালিকা:
ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, জসিম, এমরান, অসীম চন্দ্র সরকার, মামুন, রিয়াজ, শিল্পী, ইসমাইল হোসেন স্বপন, আফসার এবং একজন অজ্ঞাত পুরুষ।

