এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। জাতির নতুন স্বপ্ন বিনির্মাণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে আইনজীবীরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান রচনায় আইনজীবীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় ১৩ জন সদস্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন আইনজীবী। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী আইনজীবী সমাজ পরিবর্তনে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারেন। আইনজীবীদের বলা হয় সমাজ বিনির্মাণের কারিগর বা Social Engineer। সমাজ সংস্কার কিংবা জাতির সংকটে সব সময় আইনজীবীরা অসামান্য ভূমিকা পালন করেন তাদের অর্জিত মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর সৃজনশীলতা দিয়ে। আইনজীবীরা সমাজের মধ্যেই আরেকটি সমাজ (Community with a community)।
আইন পেশা একটি স্বতন্ত্র জীবনধারা (Way of life)। এই পেশা স্বতন্ত্র মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অনেক সমাজবিজ্ঞানী তাই আইন পেশাকে সর্বশ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবেও অভিহিত করেছেন। দেশে আইন পেশায় বহু বরেণ্য ও কীর্তিমান ব্যক্তি নিয়োজিত ছিলেন এবং আছেন। অনেক আইনজীবী আদালতের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেদের জাতীয় পর্যায়ে অধিষ্ঠিত করেছেন। কেউ কেউ জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের মেলে ধরেছেন অনন্য মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে। অথচ বর্তমানে এই পেশার মান অনেক নেমে গেছে। এ মহান পেশার প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকেই পেশাটিকে খুবই বাজেভাবে মূল্যায়ন ও বিবেচনা করে যা প্রকৃত আইনজীবীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। খোদ আইনজীবীদের কাছেই নিজেদের পেশার মান ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ।
বিচার ব্যবস্থায় বার ও বেঞ্চের সম্পর্ককে রথের দুই চাকা আবার একটি শক্তিশালী ঈগলের দুটি ডানা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয় Bar is the pillar of judiciary। দরিদ্র, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা দেশের ক্রান্তিলগ্নে আইনজীবীদের ভূমিকা অতুলনীয়। জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও আইনের মানবিক ভূমিকার সম্প্রসারণেও তাদের বড় অবদান রয়েছে। এসব ভূমিকা পালনে আইনজীবীদের পর্যাপ্ত আধুনিক জ্ঞান, দক্ষতা এবং যোগ্যতা থাকা একান্ত অপরিহার্য। এছাড়া বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারীকরণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ইত্যাদি বর্তমানে এক নতুন গতিশীল সমাজ ও বিশ্ব ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। আইনের অনেক চিরায়ত ধারণা প্রতিদিনই পাল্টে যাচ্ছে। ফলে প্রয়োজন হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভাবনী আইনগত সমাধান।
এই দক্ষতা অর্জনে আইনজীবীদের আইনের পাশাপাশি অন্যান্য মৌলিক বিষয়েও পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন দরকার। অনেক আইনজীবী তাদের পেশাগত যোগ্যতা ও দক্ষতায় আইন পেশাকে সমৃদ্ধ করেছেন। একই সাথে কিছু আইনজীবীর অদক্ষতায় বিচারপ্রার্থী অনেকেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিচার চাইতে এসে উল্টো হয়রানি ও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার অনেক অভিযোগ রয়েছে। এতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়। ফলে রাষ্ট্র কাঠামো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। বলা হয় আইনপেশা কোনো মানি মেকিং ট্রেড নয় বরং সর্বোচ্চ সততা, জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা নির্ভর পেশা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এগুলোই একজন আইনজীবীর মূল অস্ত্র।
কিন্তু বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার বর্তমান মান, বিদ্যমান নীতিমালা ও কাঠামোগত দূর্বলতা মেধারী আইনজীবীদের এ পেশায় আসার পথ অনেকটাই রুদ্ধ করে রেখেছে। একই সাথে সনদ প্রাপ্তির এই অবাধ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকেই সনদ হাতিয়ে নিয়েছে। অবধারিতভাবে এরা এই মহান পেশাকে কলংকিত করছে। এদের অনেকের বিরদ্ধে আছে ডিগ্রীর সনদ জালিয়াতির গুরতর অভিযোগ। কিছু আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরদ্ধে মানহীন শিক্ষা প্রদান এমনকি সনদ বিক্রির অভিযোগ সুপ্রতিষ্ঠিত। বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার নিম্নমানের সুযোগ নিয়ে অনেকেই এসব সহজলভ্য আইনের ডিগ্রি দিয়ে সনদ নিয়েছেন। অনেকের বিরদ্ধে বিচারপ্রার্থীদের সাথে প্রতারনার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকেই সনদ নিয়ে ব্যবসা, চাকরি এমনকি দোকানদারি ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছেন।
সাংবিধানিক সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের সনদধারী অনেকেই আছেন যাদের আদালত, আইন পেশার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্কই নেই। কিন্তু কাগজে-কলমে এরা হাইকোর্টের আইনজীবী। এদের কারণে নিয়মিত আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, আদালত, বিচার বিভাগ সবাইকে ভুগতে হচ্ছে নিয়মিত। এরা অনেকেই সুবিধামতো নিজেদের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। আইনজীবীদের পবিত্র পোশাককে কোর্টের বাইরে অপব্যবহার করার অভিযোগও আছে। এসব কারণে এই মহান পেশার মান এবং পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা বর্তমানে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
|
আইন পেশার মান এমন সর্বনিম্নগামী। কোর্টের কর্মচারী, ঠিকাদার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ সবাই এখন সনদ পাচ্ছে। নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত উভয় জায়গাতেই এরা সনদের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। এর অন্যতম কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার কাউন্সিল থেকে আইনজীবী সনদ নিতে যে যোগ্যতার প্রয়োজন তা অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে হাসিল করে নিচ্ছেন। বার কাউন্সিল বিভিন্ন সময়ে এই যোগ্যতা শিথিল করে আইন পেশার চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে। প্রতিবছর কোনো সুচিন্তিত চিন্তাভাবনা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক সনদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আইন পেশার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বার কাউন্সিল। ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের বার কাউন্সিলের সনদ দেয়া যাবে না বলে আদালতের রায় থাকলেও বার কাউন্সিল তা বাস্তবায়ন করছে না। সনদ প্রাপ্তির এই অবাধ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি আইনজীবী সনদ হাতিয়ে নিয়েছে।
এদের কেউ কোর্টের কর্মচারী, ঠিকাদার, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ ও আমলা। আবার কেউ চাকরি থেকে বরখাস্ত, অবসরপ্রাপ্ত বা বেকার। এরা সবাই আইনজীবী হতে চায়। অন্য কোনো পেশায় যেতে চায় না। অবশ্য অন্য কোনো পেশায় সেই সুযোগও নেই। এখানে শুধু বার কাউন্সিল ব্যতিক্রম। এদের সবার জন্য বার কাউন্সিল উদার। তাই এদের অনেকেই ইতিমধ্যেই সনদ নিয়ে নিয়েছে। আরও অনেকেই সুযোগের অপেক্ষায়। আদালত, আইন পেশার সাথে ন্যূনতম প্রকৃত সম্পর্ক না থাকলেও এরা নিজেদের আইনজীবী পরিচয় দিচ্ছে বার কাউন্সিলের বদান্যতায়। অবধারিতভাবেই এতে মহান আইন পেশা কলঙ্কিত হচ্ছে। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে আছে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ। আইন পেশা মূলত মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানভিত্তিক। অথচ বার কাউন্সিল বিপুল সংখ্যক সনদ দিয়ে আইন পেশাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন পদক্ষেপ নিলেও এটা কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক লেগে যাবে।
সনদ পরীক্ষায় একটি মানসম্মত সিলেবাস ও পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন আইন পেশাকে অনেকাংশে বাঁচাতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান আইন শিক্ষা প্রদানের নামে সার্টিফিকেট ব্যবসা করছে। এই মানহীন সার্টিফিকেটধারীরা যাতে কোনোভাবেই আইনজীবী সনদ না পায় তা বার কাউন্সিলকেই নিশ্চিত করতে হবে। এই মানহীন সার্টিফিকেটধারীরাই মূলত আইন পেশাকে কলুষিত করছে। বর্তমানে আইন পেশার মান সর্বনিম্নগামীতার অন্যতম প্রধান কারণ সনদ পরীক্ষার নিম্নমান। বিদ্যমান এই দুরাবস্থায় বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার মান ও পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই। সহজলভ্য আইনের ডিগ্রি ও গতানুগতিক সনদ পরীক্ষা আইন পেশাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে নিয়মিত আইনজীবীদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছে। অথচ আজকের আইনজীবী ভবিষ্যতের বিচারক, আইন প্রণেতা, সমাজ সংস্কারক ও নীতিনির্ধারক।
অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেখানে একজন প্রার্থী আইন বিষয় ছাড়াও বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়, সাধারণ গণিত, বিজ্ঞান বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি বিষয়ে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর আইন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, মানসিক সামর্থ্য, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বাচনভঙ্গি ইত্যাদি গুণাবলী ও ব্যক্তিত্বের অন্যান্য দিক, পাঠ্যক্রম বহির্ভূত ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়। তাই অনেকেই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করে ১০০ নম্বরে প্রিলিমিনারি, ৯০০ নম্বরের লিখিত ও ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই একজন প্রার্থী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমান দ্বিতীয় শ্রেণীর নিয়োগ পরীক্ষায়ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অধীনে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বার কাউন্সিলকেও সনদ পরীক্ষার সিলেবাস ও মান নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় বহুমুখী তদবির, দুর্নীতি ও অনিয়ম অবিলম্বে বন্ধ করা খুবই জরুরি।
আইনজীবী সনদের মান বজায় রাখতে বার কাউন্সিলের নীরবতায় আইনজীবীরা তাদের পেশার মর্যাদা হারাচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে আইনজীবীরা প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণ আস্থা হারাচ্ছে। বিদ্যমান এই রূঢ় বাস্তবতায় বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার মান ও পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই। সহজলভ্য আইনের ডিগ্রি ও গতানুগতিক সনদ পরীক্ষা আইন পেশাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। পেশার মান এখন তলানিতে। হতাশা চলে আসছে নিয়মিত সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে। তরুণ আইনজীবীদের হতাশা এখন পাহাড়সম। মেধা থাকা সত্ত্বেও তরুণ আইনজীবীদের অনেকেই পেশায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাছ-বিচারহীনভাবে বিপুল পরিমাণ সনদ দেওয়ার কারণে আদালত, আইন পেশার পরিবেশ অনেকদিন ধরেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আদালতে যারা নিয়মিত আসেন তারা এটা খুব ভালভাবেই উপলব্ধি করেন। বিদ্যমান অসহনীয় পরিবেশে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
বার কাউন্সিল পরীক্ষা নিয়ে গত কয়েক বছরে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে তা বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের জন্য খুবই লজ্জার। কিছু আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ মানহীন আইনী সনদ প্রদান এর মূল কারণ। কেউ কেউ পরীক্ষা ছাড়াই আইনজীবী সনদ চেয়েছে। কেউ কেউ দাবি তুলেছে এই সনদ পেলেও যেহেতু কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না তাই সনদ পরীক্ষা তুলে নেয়া হোক। এই দাবিকারীদের মূলত আইন পেশার সম্মান, মর্যাদা বা ঐতিহ্য নিয়ে ধারণা নেই। ভালো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা, জ্ঞান অর্জন করে এরা আসে না। এদের মূলত যেকোনোভাবে একটা সনদ দরকার। এরপর এরা নিশ্চিতভাবেই এই সনদের অপব্যবহার করবে। এদের ধারণাই নেই সরকারি-বেসরকারি অনেক চাকরির চেয়ে পেশাগত জীবনে একজন আইনজীবীর সাফল্য ও কাজের সুযোগ অনেক বেশি। জাতীয় জীবনে আইনজীবীদের অবদানের ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। এরা জানেও না যে সারা বিশ্বেই আইনজীবীরা বিভিন্ন সেক্টরে নেতৃত্ব দিচ্ছে নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে। বলা হয় আইনজীবীরা Natural Leader বা সহজাত নেতা। অথচ এখানে আইন পেশার ব্যাপক অবক্ষয় আমাদের সকলের জন্য গভীর বেদনার।
সম্প্রতি বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অকৃতকার্য ১৯১৪ জন পরীক্ষার্থীকে উত্তরপত্র রিভিউ এর নামে মূলত গ্রেস নাম্বার দিয়ে পাস করানো হয়। বিস্ময়করভাবে এদের পাস মার্ক ৫০ থেকে কমিয়ে ৪৫ করা হয়। এর কিছুদিন আগে হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষায়ও একই পদ্ধতিতে রিভিউ নাম দিয়ে ৫৭৯ জন ফেল করা পরীক্ষার্থীকে পাস করানো হয়। বার কাউন্সিলের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন। এর আগে কখনোই বার কাউন্সিলে এরকম হয়নি। এ ঘটনায় আইনজীবী সমাজ ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। কোনো কোনো জেলা বার এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রেজুলেশন পাস করে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে নিম্ন আদালতের ১৯১৪ জনের ফলাফল বাতিল করা হলেও হাইকোর্ট বিভাগে বিতর্কিত রিভিউ নিয়ে পাস করা ৫৭৯ জনের ফলাফল নিয়ে এখন অবধি কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। বার কাউন্সিলের এক কর্মচারীর পরীক্ষার্থী প্রতি ৪ লাখ টাকা নেয়ার সংবাদ সারাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে মানসম্পন্ন সনদ পরীক্ষার অভাবে আইনজীবীরা তাদের পেশার মর্যাদা হারাচ্ছেন। সকল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পূর্বের ন্যায় আইনজীবী সমাজ জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এই অবক্ষয় একই সাথে বিচার বিভাগকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। সনদ পরীক্ষার সিলেবাস আধুনিকায়নের পাশাপাশি সিলেবাসে আইন ছাড়াও মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি একান্ত আবশ্যক। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মানোন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমানে কিছু আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানহীন সনদ বাণিজ্যের সুষ্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এসব সনদ দিয়ে অনেকেই আইনজীবী সনদও পেয়ে গেছেন। মানহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা বার কাউন্সিলের পক্ষে অসম্ভব। তাই সনদ পরীক্ষার মান এমনভাবে উন্নত করতে হবে যাতে কোনোভাবেই অযোগ্য ও সুযোগ সন্ধানীরা সনদ না পায়। মানসম্পন্ন আইনজীবী তৈরি করা বার কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বার কাউন্সিলকে অবিলম্বে এর সনদ পরীক্ষার সর্বোচ্চ মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাছ-বিচারহীনভাবে সনদ দেওয়ার প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। গুটিকয়েক ব্যক্তি এই অব্যবস্থায় লাভবান হলেও সমগ্র আইনজীবী সমাজ, সাধারণ মানুষ ও পুরো বিচার বিভাগ এতে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সনদ নিয়ে তার অপব্যবহার খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি মানসম্পন্ন সনদ পরীক্ষা আইনপেশার চলমান সংকটকে অনেকটা দূর করতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগের সনদ পরীক্ষায় প্রিলিমিনারির প্রচলন বার কাউন্সিলের একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হলেও পরবর্তীতে তা বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। যা পেশার মর্যাদা ও সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থবিরোধী। মানসম্পন্ন পরীক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনকে সিলেবাস প্রণয়ন ও পরীক্ষা নেয়ার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। একমাত্র মেধাবী ও যোগ্য আইনজীবীরাই আদালতকে সহায়তা করতে পারে, ন্যায়বিচার নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে, বিচার বিভাগকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
দেশে শুধু আইনপেশায়ই এক ধরনের অদ্ভুত সুযোগ আছে। এখানে যে কেউ, যে কোন সময়, যে কোন বয়সে এসেই আইনজীবী হতে পারে। অন্য কোনো পেশায় এই অদ্ভুত সুযোগটি নেই। অনেকে কোথাও কিছু করতে না পেরে আবার চাকরি, ব্যবসা, কর্মসংস্থান হারিয়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মামলায় জড়িত হয়ে, চাকরি থেকে অবসর নিয়ে যেকোনো বয়সে এসে আইনজীবী হতে চায়। এরা কেউই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো পেশাজীবী হতে চায় না। এরা সবাই আইনজীবীই হতে চায়। দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এদের জন্য উদার না হলেও বার কাউন্সিল এদের জন্য খুবই উদার। এই উদারতার সুযোগ নিয়ে এরা বৃদ্ধ বয়সেও আইনজীবী সনদ পেয়ে যাচ্ছে। এই বয়সে অন্য কাজ করে এরা কিভাবে বার কাউন্সিলের সব পরীক্ষায় পাস করে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। অথচ অনেক নিয়মিত মেধাবী পরীক্ষার্থী বার কাউন্সিল পরীক্ষায় ফেল করে। এই বয়সে আইন পেশায় এসে এরা মূলত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চান। আইনজীবী, আদালত, বিচার বিভাগ ও বিচারপ্রার্থীদের প্রতি এদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। এরা আদালত ও আদালতের বাইরে একটা অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করে। যার ভুক্তভোগী খোদ বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ ও বিচারপ্রার্থী মানুষ। আইন পেশার মান উন্নয়নে হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে সনদ পাওয়ার জন্য বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কিন্তু আজ অবধি বার কাউন্সিল তা বাস্তবায়ন করেনি। বার কাউন্সিলের অবিলম্বে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১৩ হাজার ও ঢাকা বারে ৩০ হাজারের বেশি আইনজীবী। বার কাউন্সিল কি যুক্তিতে এই বিশাল সংখ্যক সনদ দিয়ে রেখেছে তা অবিলম্বে মূল্যায়ন প্রয়োজন। এত বিপুল সংখ্যক সনদ দেয়া হয়েছে অথচ কাউকে এক ঘণ্টার একটা প্রশিক্ষণ বা পেশাগত কোনো গাইডলাইন দেয়া হয়নি। বর্তমান সময়ে এটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব ও সত্য। সবাই লক্ষ্যহীনভাবে ছুটছে। কেউ কেউ টিকে যাচ্ছে। বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ আইনজীবীরাই বেশি ভুগছে।
বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ সংস্থা। আইন পেশার এই দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সনদ পরীক্ষার মান নিয়ে বার কাউন্সিলকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। সব পেশাজীবীরা পড়াশোনা, জ্ঞান চর্চা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছেন। এই অবস্থায় আইন পেশা কোনোভাবেই এত পিছিয়ে থাকতে পারে না। আইন পেশা ব্যাপক জ্ঞানভিত্তিক পেশা। নিয়মিত পড়াশোনা, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণার মাধ্যমেই আইনজীবীরা পেশাগত উৎকর্ষ অর্জন করেন। এই মহান পেশায় সুযোগ সন্ধানীদের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে মেধাবীদের আসার পরিবেশ তৈরি করে দেয়া বার কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বার কাউন্সিলকে অবশ্যই ভাবতে হবে উন্নত বিশ্ব বা প্রতিবেশী দেশের আইনজীবীদের চেয়ে আমরা কত বছর পিছিয়ে আছি। তাদের চিন্তা করতে হবে তরুণ ও মেধাবী আইনজীবীদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের আইন পেশাকে কিভাবে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করা যায়। আইনজীবী ও আইন পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে বার কাউন্সিলের অবিলম্বে একটি মাস্টার প্ল্যান ও ভিশন নেয়া দরকার। তরুণ আইনজীবীদের জন্য একটি সুন্দর পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা বার কাউন্সিলের অন্যতম দায়িত্ব। এই গরিব দেশের কোটি কোটি অসহায় বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়ও বার কাউন্সিলের আছে।
- লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
০১৭১৮-০৬৭৪৯৮
Email- blackandwhite.lawhouse@gmail.com

