এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। জাতির নতুন স্বপ্ন বিনির্মাণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে আইনজীবীরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান রচনায় আইনজীবীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবী পেশার নিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একটি সাংবিধানিক সংস্থা। আইনজীবীদের নিবন্ধন, সনদ প্রদান এবং শৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এই সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বার কাউন্সিলের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি পরীক্ষা পরিচালনা, সনদ প্রদান এবং আইনজীবীদের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ। পাশাপাশি কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে এই সংস্থার। সংস্থাটির নেতৃত্বে একজন চেয়ারম্যান থাকেন, যিনি সাধারণত বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে থাকেন। এছাড়া নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়।
১৯৭২ সালে গঠিত এই সংস্থাটি মূলত বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-এর আওতায় পরিচালিত হয়। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত এক আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠালাভ করে। এর সদস্য সংখ্যা রাখা হয় ১৫ জন। প্রতিটি কমিটির মেয়াদ থাকে ৩ বছর। এরমধ্যে পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের সভাপতি থাকেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। বাকি ১৪ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জন আইনজীবীদের মধ্য থেকে তাদের ভোটে নির্বাচিত, বাকি ৭ জন প্রতিটি গ্রপ থেকে একজন করে ৭টি গ্রুপে বিভক্ত স্থানীয় আইনজীবী সমিতিগুলির সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় ১৩ জন সদস্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন আইনজীবী। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী আইনজীবী সমাজ পরিবর্তনে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারেন। আইনজীবীদের বলা হয় সমাজ বিনির্মাণের কারিগর বা Social Engineer। সমাজ সংস্কার কিংবা জাতির সংকটে সব সময় আইনজীবীরা অসামান্য ভূমিকা পালন করেন তাদের অর্জিত মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর সৃজনশীলতা দিয়ে। আইনজীবীরা সমাজের মধ্যেই আরেকটি সমাজ (Community with a community)।
আইনজীবী সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিচার ব্যবস্থায় পেশাগত মান উন্নয়নে বার কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে নতুন আইনজীবীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার মান ধরে রাখতেও কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
বার কাউন্সিল গঠনের প্রেক্ষাপট:
১৭৭৪ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগকৃত অ্যাটর্নিদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব লেটার্স প্যাটেন্টের ১১ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালতের ওপর ন্যস্ত হয়। ১৭৯৩ সালের ৭ নং প্রবিধান অনুযায়ী সদর দেওয়ানি আদালতে ও অধস্তন কোম্পানি আদালতগুলিতে আইনপেশায় নিয়োজিত উকিলদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ করতো সুপ্রিম কোর্ট।
১৮৬২ সালে সদর দেওয়ানি আদালত ও সদর নেজামত আদালত তুলে দিয়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে জজিয়তি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। উক্ত হাইকোর্ট তার আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল (রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগকৃত সর্বোচ্চ আইনকর্মকর্তা), উকিল, কৌঁশুলিদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পায়। তখন বেশিরভাগ আইনজীবীরা ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড থেকে ডিগ্রি অর্জন করা ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ অথবা স্কটল্যান্ডের ফ্যাকাল্টি অফ অ্যাডভোকেটস-এর সদস্য ছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলদের অনুমোদন সাপেক্ষে আইনজীবীরা কলকাতা হাইকোর্টে হাজিরা দেয়া ও ওকালতি করতে পারতেন এবং ওই আদালতের আপিল বিভাগ ও অন্যান্য অধস্তন আদালতে ওকালতি করার অনুমতি নিতেন। সেসময় হাইকোর্টে আইন চর্চাকারীরা ছিলেন অ্যাডভোকেট বা ব্যারিস্টার যাদের ইংরেজি আইনে ডিগ্রি ছিলো। তবে এ পদ্ধতিতে দেশীয় ভারতীয় আইনজীবী যাদের ব্রিটিশ আইনের কোনো ডিগ্রি নেই তারা অধস্তন আদালত ছাড়া হাইকোর্টে মূল বিভাগে কাজ করার তেমন কোনো অধিকার পেতেন না, তাদের পদবী ছিলো উকিল বা ভাকিল (Vakil), এরা মূলত মুসলিম ও হিন্দু আইন এবং মুঘল দেওয়ানি ও ফৌজদারী আইনে শিক্ষা নিতেন ।
তাই উপমহাদেশে একটি সর্বভারতীয় বার গঠন এবং অ্যাডভোকেট ও উকিলদের মধ্যে পার্থক্য বিলোপ করার জন্যে জোরালো দাবি ওঠে। এ দাবির প্রেক্ষিতে ১৯২৩ সালে ইন্ডিয়ান বার কমিটি গঠন করা হয়। এর সভাপতি ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড চ্যামিয়ার। ১৯২৪ সালে ওই কমিটি প্রতিবেদন পেশ করে এবং ইন্ডিয়ান বার কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯২৬ কার্যকর করে।
ভারতের বার কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিটি হাইকোর্টে যৌথ সংগঠন হিসেবে একটি করে বার কাউন্সিল গঠনের বিধি প্রবর্তন করা হয়। ওইসব কাউন্সিলে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত প্রতিটি বার কাউন্সিলে অ্যাডভোকেট জেনারেল, হাইকোর্ট কর্তৃক মনোনীত ৪ জন সদস্য এবং হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটদের নিজেদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ১০ জন সদস্য থাকতেন।
তখন হাইকোর্টের অনুমতি সাপেক্ষে বার কাউন্সিলকে আইনজীবীদের নিবন্ধন ও তাদের নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুন তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে কোনও ব্যক্তিকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে হাইকোর্ট আপত্তি জানালে তা খর্ব করার অধিকার বার কাউন্সিলের ছিলো না। এ আইনে হাইকোর্টের মূল বিভাগে আইন ব্যবসায়ে আগ্রহী আবেদনকারীদের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা এবং তাদের গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান এবাং কী কী শর্তে বা পরিস্থিতিতে তারা ওই আদালতের অধীনে আইনব্যবসা করতে পারবেন তার সবটাই নির্ধারণ করতো কলকাতার হাইকোর্ট।
হাইকোর্ট আইনজীবীদের কোনও অসদাচরণের অভিযোগের তদন্তকার্য বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালের উপর ন্যস্ত করতে পারত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীকে তিরস্কার, তার আইন ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারত। আইনজীবীদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল হাইকোর্টের হাতে, বার কাউন্সিল ছিল নেহাৎ একটি উপদেষ্টা সংগঠন। কালক্রমে কলকাতা হাইকোর্ট তার বিধিবিধান উদার করে এবং ব্যারিস্টার নন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ডিগ্রি নেই এমন ভারতীয় উকিলদের হাইকোর্টে মূল মামলা পরিচালনার অনুমতি দেয়।
১৯৬৫ সালের লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ১৯৬৫ সালের এই আইনের ফলে সমগ্র দেশের জন্য একটি এবং পাকিস্তানের প্রতি দুই প্রদেশের জন্য একটি করে বার কাউন্সিল গঠিত হয়। এতে ছিলেন ১৪ জন নির্বাচিত সদস্য এবং পদাধিকারবলে একজন সভাপতি। এ আইনে ব্যারিস্টার ও নন-ব্যারিস্টার এবং অন্যান্য শ্রেণীর আইনজীবীদের মধ্যকার পার্থক্য লোপ পায় এবং অ্যাডভোকেট পদবীতে দুই শ্রেণীর আইনজীবীর নিবন্ধনের বিধান চালু হয়; এক শ্রেণী হাইকোর্টের জন্য এবং অপর শ্রেণী অধস্তন আদালতসমূহের জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশবলে ১৯৬৫ সালের আইন বাতিল করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বার কাউন্সিল অর্ডার অ্যান্ড রুলস, ১৯৭২ প্রণয়ন করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়।
বার কাউন্সিলের প্রশাসনিক কার্যাবলি:
বাংলাদেশের নাগরিক ও ন্যূনতম ২১ বছর বয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি যিনি আইনের স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী বা ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টার হিসেবে নিবন্ধিত, অন্যূন ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের অধীনে ৬ মাসের শিক্ষানবিসী সম্পন্ন করে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি পরিশোধের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের অধীনস্থ আদালতসমূহে আইনব্যবসা করার লক্ষ্যে নিবন্ধনের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হন।
নিবন্ধনের জন্য বার কাউন্সিল কর্তৃক পরিচালিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অতিরিক্ত ফি প্রদানের মাধ্যমে তিনি অ্যাডভোকেট হিসেবে নিবন্ধিত হন। কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তে বার কাউন্সিল আইনজীবী সমিতি ও আইনজীবীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। নিবন্ধন লাভের পর প্রত্যেক অ্যাডভোকেটকে কোনো না কোনো আইনজীবী সমিতির সদস্য হতে হয়।
আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ তদন্ত ও বিচারের জন্য বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৯ সালে এই জাতীয় পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল ছিল। একটি ট্রাইব্যুনাল কোনও আইনজীবীকে তিরস্কার বা স্থগিত করতে বা অনুশীলন থেকে সরিয়ে দিতে পারে। এটি ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৩৭৮টি অভিযোগের বিষয়ে শুনানি করেছে। এসব অভিযোগে ৯ জন আইনজীবী তাদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন এবং ৬ জনকে সীমিত সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
বয়সসীমা ছাড়াই বার কাউন্সিল পরীক্ষা, প্রশ্নের মুখে পেশার মান:
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষা ঘিরে নতুন করে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে বয়সসীমা সংক্রান্ত বিষয়টি। আইনজীবী পেশায় প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী মহলে জোরালো দাবি উঠেছে—এ ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর যে কোনো বয়সের প্রার্থীই বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন অর্থাৎ, একজন প্রার্থী ২৫ বছর বয়সে কিংবা ৪৫ বছর বয়সেও একইভাবে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। এই নীতিকে কেন্দ্র করেই এখন পেশাগত কাঠামো ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাজু হাওলাদার পলাশ বলেন, বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার বর্তমান মান, বিদ্যমান নীতিমালা ও কাঠামোগত দূর্বলতা মেধারী আইনজীবীদের এ পেশায় আসার পথ অনেকটাই রুদ্ধ করে রেখেছে। একই সাথে সনদ প্রাপ্তির এই অবাধ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকেই সনদ হাতিয়ে নিয়েছে। অবধারিতভাবে এরা এই মহান পেশাকে কলংকিত করছে। এদের অনেকের বিরদ্ধে আছে ডিগ্রীর সনদ জালিয়াতির গুরতর অভিযোগ।
কিছু আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরদ্ধে মানহীন শিক্ষা প্রদান এমনকি সনদ বিক্রির অভিযোগ সুপ্রতিষ্ঠিত। বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার নিম্নমানের সুযোগ নিয়ে অনেকেই এসব সহজলভ্য আইনের ডিগ্রি দিয়ে সনদ নিয়েছেন। অনেকের বিরদ্ধে বিচারপ্রার্থীদের সাথে প্রতারনার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকেই সনদ নিয়ে ব্যবসা, চাকরি এমনকি দোকানদারি ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছেন।
আইন পেশার মান এমন সর্বনিম্নগামী। কোর্টের কর্মচারী, ঠিকাদার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ সবাই এখন সনদ পাচ্ছে। নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত উভয় জায়গাতেই এরা সনদের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। এর অন্যতম কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার কাউন্সিল থেকে আইনজীবী সনদ নিতে যে যোগ্যতার প্রয়োজন তা অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে হাসিল করে নিচ্ছেন।
বার কাউন্সিল বিভিন্ন সময়ে এই যোগ্যতা শিথিল করে আইন পেশার চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে। প্রতিবছর কোনো সুচিন্তিত চিন্তাভাবনা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক সনদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আইন পেশার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বার কাউন্সিল। ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের বার কাউন্সিলের সনদ দেয়া যাবে না বলে আদালতের রায় থাকলেও বার কাউন্সিল তা বাস্তবায়ন করছে না। সনদ প্রাপ্তির এই অবাধ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি আইনজীবী সনদ হাতিয়ে নিয়েছে।
এদের কেউ কোর্টের কর্মচারী, ঠিকাদার, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ ও আমলা। আবার কেউ চাকরি থেকে বরখাস্ত, অবসরপ্রাপ্ত বা বেকার। এরা সবাই আইনজীবী হতে চায়। অন্য কোনো পেশায় যেতে চায় না। অবশ্য অন্য কোনো পেশায় সেই সুযোগও নেই। এখানে শুধু বার কাউন্সিল ব্যতিক্রম। এদের সবার জন্য বার কাউন্সিল উদার। তাই এদের অনেকেই ইতিমধ্যেই সনদ নিয়ে নিয়েছে। আরও অনেকেই সুযোগের অপেক্ষায়। আদালত, আইন পেশার সাথে ন্যূনতম প্রকৃত সম্পর্ক না থাকলেও এরা নিজেদের আইনজীবী পরিচয় দিচ্ছে বার কাউন্সিলের বদান্যতায়। অবধারিতভাবেই এতে মহান আইন পেশা কলঙ্কিত হচ্ছে। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে আছে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ। আইন পেশা মূলত মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানভিত্তিক। অথচ বার কাউন্সিল বিপুল সংখ্যক সনদ দিয়ে আইন পেশাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন পদক্ষেপ নিলেও এটা কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক লেগে যাবে।
|
সনদ পরীক্ষায় একটি মানসম্মত সিলেবাস ও পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন আইন পেশাকে অনেকাংশে বাঁচাতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান আইন শিক্ষা প্রদানের নামে সার্টিফিকেট ব্যবসা করছে। এই মানহীন সার্টিফিকেটধারীরা যাতে কোনোভাবেই আইনজীবী সনদ না পায় তা বার কাউন্সিলকেই নিশ্চিত করতে হবে। এই মানহীন সার্টিফিকেটধারীরাই মূলত আইন পেশাকে কলুষিত করছে। বর্তমানে আইন পেশার মান সর্বনিম্নগামীতার অন্যতম প্রধান কারণ সনদ পরীক্ষার নিম্নমান।
বিদ্যমান এই দুরাবস্থায় বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষার মান ও পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই। সহজলভ্য আইনের ডিগ্রি ও গতানুগতিক সনদ পরীক্ষা আইন পেশাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে নিয়মিত আইনজীবীদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছে। অথচ আজকের আইনজীবী ভবিষ্যতের বিচারক, আইন প্রণেতা, সমাজ সংস্কারক ও নীতিনির্ধারক।
বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১৩ হাজার ও ঢাকা বারে ৩০ হাজারের বেশি আইনজীবী। বার কাউন্সিল কি যুক্তিতে এই বিশাল সংখ্যক সনদ দিয়ে রেখেছে তা অবিলম্বে মূল্যায়ন প্রয়োজন। এত বিপুল সংখ্যক সনদ দেয়া হয়েছে অথচ কাউকে এক ঘণ্টার একটা প্রশিক্ষণ বা পেশাগত কোনো গাইডলাইন দেয়া হয়নি। বর্তমান সময়ে এটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব ও সত্য। সবাই লক্ষ্যহীনভাবে ছুটছে। কেউ কেউ টিকে যাচ্ছে। বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ আইনজীবীরাই বেশি ভুগছে। বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ সংস্থা। আইন পেশার এই দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সনদ পরীক্ষার মান নিয়ে বার কাউন্সিলকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইনজীবী মহলের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বয়সসীমা না থাকায় পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন অন্য পেশায় যুক্ত থাকার পর কেউ আইন পেশায় প্রবেশ করলে তা নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পেশাগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় এবং আদালতে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়।
আইনজীবীদের দাবি, নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকলে পেশায় প্রবেশ আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং একটি মানসম্মত প্রজন্ম গড়ে তোলা সহজ হবে। তাদের মতে, বয়সসীমা নির্ধারণ করলে তরুণ আইনজীবীদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং বিচার ব্যবস্থায় একটি গতিশীলতা বজায় থাকবে।
বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষাকে ঘিরে এমন বিতর্ক নতুন নয়, তবে বয়সসীমা ইস্যুটি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। আইনজীবী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বয়স নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে।
পেশাগত মান উন্নয়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ আইনজীবী প্রজন্মের কাঠামো—বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করছে বার কাউন্সিলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
বার কাউন্সিলকে অবশ্যই ভাবতে হবে উন্নত বিশ্ব বা প্রতিবেশী দেশের আইনজীবীদের চেয়ে আমরা কত বছর পিছিয়ে আছি। তাদের চিন্তা করতে হবে তরুণ ও মেধাবী আইনজীবীদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের আইন পেশাকে কিভাবে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করা যায়। আইনজীবী ও আইন পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে বার কাউন্সিলের অবিলম্বে একটি মাস্টার প্ল্যান ও ভিশন নেয়া দরকার। তরুণ আইনজীবীদের জন্য একটি সুন্দর পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা বার কাউন্সিলের অন্যতম দায়িত্ব। এই গরিব দেশের কোটি কোটি অসহায় বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়ও বার কাউন্সিলের আছে।

