ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি পাসপোর্ট পাবেন কি না—এ প্রশ্নটি অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে মূলত “বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩” এবং এ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ের ওপর। প্রচলিত আইন ও বিচারিক ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বেশ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হন, তাহলে তার পাসপোর্ট ইস্যু বা নবায়নের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। বিশেষ করে মামলাটি যদি গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে পাসপোর্ট প্রদান স্থগিত রাখা বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ থাকে। এর পেছনে মূল যুক্তি হলো—অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়।
তবে শুধু মামলা থাকলেই যে পাসপোর্ট পাওয়া যাবে না, বিষয়টি এমন সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তি পাসপোর্ট পেতে পারেন। আদালত বিবেচনা করে দেখেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পলাতক হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন কি না, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন কী, এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় তার উপস্থিতি কতটা প্রয়োজন।
উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে দেখা গেছে, ব্যক্তির মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক সময় শর্তসাপেক্ষে পাসপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে ফেরার বাধ্যবাধকতা, জামিনের শর্ত কঠোর করা, অথবা আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার মতো শর্ত আরোপ করা হয়।
সর্বোপরি বলা যায়, ফৌজদারি মামলার অভিযুক্তদের পাসপোর্ট ইস্যু বা নবায়ন কোনো একক নিয়মে নির্ধারিত হয় না। এটি নির্ভর করে মামলার প্রকৃতি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিস্থিতির ওপর। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা করে আইনি মূল্যায়ন জরুরি।
বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিধান:
ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পাসপোর্ট ইস্যু বা নবায়নের প্রশ্নে “বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩” স্পষ্ট কিছু বিধান নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৬-এ এমন কিছু পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
প্রথমত, বিচারাধীন মামলার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনুচ্ছেদ ৬(১)(ই) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ফৌজদারি মামলায় আদালতে হাজিরা এড়ানোর চেষ্টা করেন বা তার দেশত্যাগের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট আবেদন নাকচ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো বিচারপ্রক্রিয়া যাতে বিঘ্নিত না হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের আওতায় থাকেন।
দ্বিতীয়ত, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। অনুচ্ছেদ ৬(১)(সি) অনুসারে, আবেদনকারী যদি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার আগের পাঁচ বছরের মধ্যে এ ধরনের অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন, তবে তার পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ বিধানটি মূলত জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণীত।
বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপট (২০২৪-২০২৬):
সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে ফৌজদারি মামলার অভিযুক্তদের পাসপোর্ট প্রদান নিয়ে নীতিগত অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ২০২৪-এর পর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন বিভাগ এ বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, যা বাস্তবে পাসপোর্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও সীমিত করেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির এক সিদ্ধান্তে এ অবস্থান স্পষ্ট হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, দেশ-বিদেশে পলাতক আসামি এবং নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলায় জড়িতদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট সেবা বন্ধ রাখা বা বিদ্যমান পাসপোর্ট বাতিল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযুক্তদের বিচারপ্রক্রিয়ায় নিশ্চিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পাসপোর্ট আবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো পুলিশ ভেরিফিকেশন। আবেদন জমা দেওয়ার পর পুলিশ তদন্তে যদি দেখা যায়, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে—যেমন হত্যা, জালিয়াতি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অভিযোগ—এবং মামলাটি চার্জশিট পর্যায়ে বা বিচারাধীন অবস্থায় আছে, তাহলে সাধারণত নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অনেক ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ:
ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পাসপোর্ট প্রাপ্তি নিয়ে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, পাসপোর্ট পাওয়া একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের অংশ। তবে এই অধিকার সম্পূর্ণ অবাধ নয়। আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা পরোয়ানা থাকলে পাসপোর্ট ইস্যু বা বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
আদালত আরও উল্লেখ করেছে, কোনো মামলা যদি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে এবং আদালত থেকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি না করা হয়, তাহলে আইনগতভাবে পাসপোর্ট পেতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে “অভিযুক্ত” ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। ফলে আইনি সুযোগ থাকলেও অনেক সময় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তব চিত্র ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। তদন্তাধীন সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে অনেক সময় ডিআইপি (DIP) পর্যায়ে আবেদন স্থগিত রাখা হয়। অন্যদিকে, মামলাটি যদি চার্জশিটের পর আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় থাকে, তাহলে আদালতের বিশেষ অনুমতি বা অনাপত্তি ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফেরারি বা পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে আইন আরও কঠোর। এ ধরনের ব্যক্তিদের কোনোভাবেই পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে, যারা দণ্ডপ্রাপ্ত, তাদের ক্ষেত্রে সাজা ভোগের পর নির্দিষ্ট সময় পার না হওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় না।
এ অবস্থায়, কোনো ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট মামলার কারণে পাসপোর্ট জটিলতায় পড়েন, তাহলে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সংশ্লিষ্ট আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। আদালত থেকে অনাপত্তি বা বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি সংক্রান্ত আদেশ গ্রহণ করা গেলে তা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায় এবং পাসপোর্ট প্রাপ্তির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আইনি অধিকার ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়টি নির্ধারিত হচ্ছে।

