একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং মর্যাদাশীল বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেন বিজ্ঞ আইনজীবীরা। আইনজীবীদের মেধা, সততা এবং পেশাগত আচরণের ওপর আদালতের গৌরব এবং বিচারপ্রার্থীদের আস্থা নির্ভর করে।
বাংলাদেশে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার নিয়ন্ত্রিত হয় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ১৯৭২ সালের অর্ডার এবং বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট’ (Canons of Professional Conduct and Etiquette) দ্বারা। আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক আগে তৈরি এই বিধিমালা তৎকালীন বাস্তবতায় অত্যন্ত চমৎকার ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু দীর্ঘ ৫৩ বছর পর, আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং গ্লোবাল লিগ্যাল প্র্যাকটিসের যুগে এই পুরনো আইনটি কি আসলেই বর্তমান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আমরা অত্যন্ত আশার সাথে লক্ষ্য করছি যে, বর্তমান সরকার এবং আইন মন্ত্রণালয় বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন ও সংস্কারে নানামুখী প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এই সংস্কার যাত্রাকে আরও পূর্ণতা দিতে হলে আইনি পেশার মূল চালিকাশক্তি—আইনজীবীদের আচরণ বিধিমালাকেও যুগোপযোগী করা অপরিহার্য।
তাই দেশের আইন ব্যবস্থার দুই অভিভাবক—মাননীয় আইনমন্ত্রী জনাব মোঃ আসাদুজ্জামান এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সম্মানিত চেয়ারম্যান, মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব রুহুল কুদ্দুস কাজল স্যারদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশ্ববাজারের বাস্তবতায় কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
উন্নত বিশ্ব আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
মাননীয় অভিভাবকদ্বয়ের সমীপে পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা: বর্তমান যুগোপযোগী বাস্তবতায় বার কাউন্সিলের আচরণ বিধিতে মূলত চারটি প্রধান ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন ও নতুন ধারা সংযোজন করার জন্য আইন মন্ত্রণালয় এবং বার কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন:
- ক। আইনজীবীরা তাদের পেশাদার প্রোফাইলে (যেমন লিংকডইন বা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট) শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেম্বারশিপ, প্রকাশিত আইনি বই বা গবেষণাপত্র এবং প্র্যাকটিসের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র প্রকাশ করতে পারবেন।
- খ। আইনি পোশাক (কোর্ট-গাউন, ব্যান্ড) পরে টিকটক বা ফেসবুক রিলসে চটুল বিনোদনমূলক ও ট্রোলিং কনটেন্ট তৈরি করা ‘পেশাগত অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির আওতাভুক্ত করতে হবে।
- গ। মক্কেলের অনুমতি ছাড়া মামলার নথিপত্র বা চ্যাটের স্ক্রিনশট সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা আইনি গোপনীয়তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে সাব্যস্ত করতে হবে। ক্লায়েন্টের পরিচয় প্রকাশ না করলেও যদি কোনো হাইপোথেটিক্যাল পোস্ট থেকে তৃতীয় পক্ষ মক্কেলকে শনাক্ত করতে পারে, তাহলে তাও গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
- ক। বাংলাদেশে একজন আইনজীবী নিজেকে “সেরা” দাবি করতে বা “১০০% মামলা জেতানোর গ্যারান্টি” দিতে পারবেন না।
- খ। কিন্তু তিনি যে নির্দিষ্ট বিষয়ে (যেমন লিটিগেশন, রিট, সাইবার ক্রাইম ইত্যাদি) কাজ করেন, সেই তথ্যটুকু ভিজিটিং কার্ড, লেটারহেড বা ওয়েবসাইটে মার্জিতভাবে উল্লেখের অনুমতি দেওয়া উচিত।
- গ। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিলিয়ে ভিজিটিং কার্ডে QR Code ব্যবহারের বিধান রাখা যেতে পারে, যা স্ক্যান করলে সরাসরি ল ফার্মের প্রোফাইল বা চেম্বারের অবস্থান জানা যাবে।
- ক। আদালতে বিচারাধীন (Sub-judice) মামলার মেরিট বা গুণাগুণ নিয়ে রায়ের আগে গণমাধ্যমে এমন কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না, যা বিচারপ্রক্রিয়া বা জনমতকে প্রভাবিত করে।
- খ। বিচার চলাকালে এমন কোনো মন্তব্য করা যাবে না যা সরাসরি বিচারকাজকে প্রভাবিত করতে পারে।
- গ। আদালত প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট ‘মিডিয়া জোন’ নির্ধারণ এবং আদালত কক্ষের বাইরে ক্যামেরার সামনে উত্তেজনাপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধে কার্যকর বিধান রাখতে হবে।
আইন পেশার ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে, তরুণ আইনজীবীদের মেধা বিকাশের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করতে এবং বিচারপ্রার্থীদের সঠিক তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে মাননীয় আইনমন্ত্রী এবং মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেলের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আচরণ বিধিমালার দ্রুত সংশোধন ও আধুনিকায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
- লেখক: কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

