বার (আইনজীবী) ও বেঞ্চ (বিচারক) বিচার বিভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বিচার বিভাগ এবং দক্ষ আইনজীবী সমাজের বিকল্প নেই কিন্তু বিচার বিভাগের জন্য বর্তমান বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত বিধিবদ্ধ সংস্থা। আইনজীবীদের বার্ষিক ফি, নিবন্ধন, এবং নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হিসেবে এই বার কাউন্সিল পরিচালিত হয়।
সরকারি কোষাগার থেকে বার কাউন্সিলের জন্য ফি-বছর কোনো বার্ষিক বাজেট বা খণ্ডকালীন বাজেট বরাদ্দের রেকর্ড বা তথ্য কোথাও খুঁজে পেলাম না! তার মানে একজন আইনজীবী নিজে পড়াশোনা করে, ক্যারিয়ারের শুরুতেই স্ট্রাগল করলেও তাদের আয়ের টাকায় বার কাউন্সিল পরিচালিত হবে। কোন ধরনের প্রশিক্ষণ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ছাড়াই প্রতিবছর একদল আইনজীবীকে নিষ্ঠুর এই পেশা শুরু করতে হয় এবং বিচার বিভাগ প্রত্যাশা করে এই আইনজীবীরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে। একজন আইনজীবী নিজে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করবেন এবং বিচার বিভাগকে কার্যকরী করবেন ও দেশের মানুষকে সর্বোচ্চ আইনি সেবা দিয়ে যাবেন।
আইনজীবীদের অভিভাবক সংস্থা এই বার কাউন্সিল যখন একজন আইনজীবীর জন্য কোন অবদানই রাখতে পারে না তখন বার কাউন্সিল অভিভাবকত্বের মর্যাদা হারিয়ে ফেলে! বার কাউন্সিলের পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে যখন পেশার উন্নয়নে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন বার কাউন্সিল তার অভিভাবকত্বের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়! অথচ রাজস্ব খাতে বড় ভূমিকা রাখে বার কাউন্সিলের নিবন্ধিত সারা দেশের প্রায় ৮০,০০০ আইনজীবী। বছরে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব উত্তোলনের কারিগর আইনজীবীদের জন্য প্রতিবছর বাজেটে কোন বরাদ্দই থাকে না!
গত আট বছরে অধস্তন আদালতে প্রায় ৩০ হাজার এবং সুপ্রিম কোর্টে প্রায় আট হাজার আইনজীবী প্র্যাকটিসের অনুমতি পেয়েছেন কিন্তু আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা আইনজীবী সমিতিগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাজেটে কোনো উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ নেই। আইনজীবীর সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ আইনজীবীর সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। নবীন ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ এবং বিচারপ্রার্থী জনগণ গুরুতর সংকটের মুখোমুখি হবে।
আদালত ও আইনজীবী সমিতির অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ; প্রতিটি আইনজীবী সমিতির জন্য পৃথক বরাদ্দ; শিক্ষানবিশ, নবীন ও প্রবীণ আইনজীবীদের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও অবসর ভাতা, আইনজীবীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল, বিশেষায়িত ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি এবং সময়ের দাবী।
একজন আইনজীবীর পেশাগত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা ব্যতীত বিচারে আইনজীবীর সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রত্যাশা অবাস্তব। আইনজীবীদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, উন্নত ও ডিজিটাল কোর্টরুম, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগে সরকারের বিনিয়োগ অত্যাবশ্যক।
প্রতিবছর বাজেটে সারা দেশের আইনজীবীদের জেলা বার এসোসিয়েশন ও বার কাউন্সিল বরাবরই উপেক্ষিতই থাকে অথচ বিচার বিভাগ তাদের কাছে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করে। এবারের ২০২৬-২০২৭ বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং বার কাউন্সিলের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ প্রত্যাশা করছি। অন্যথায় বিচারের আয়োজন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে, রাষ্ট্র আরো ন্যুয়ে পড়বে!
- লেখক: রাশেদুল হক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

