হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১ হাজার ২৬৫টি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনসংক্রান্ত মামলা। এই তথ্য পাওয়া গেছে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী। একই সময়ে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৬টি মামলা। আর বিচারিক আদালত থেকে নতুন করে এসেছে ১৯টি মামলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতি বছর যত মামলা আসছে, তার তুলনায় নিষ্পত্তির হার কম হওয়ায় হাইকোর্টে অনিষ্পন্ন মামলার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৫টিতে।
নিষ্পত্তির ধীর গতি ও পরিসংখ্যান:
২০২৫ সালে হাইকোর্টে এসেছে ১৫৭টি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন মামলা। একই বছরে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৯টি। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে নিষ্পত্তি হয় ১০টি মামলা।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে ২০১৮ সালের দাখিল হওয়া মামলার শুনানি চলছে। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪২টি মামলা শুনানির অপেক্ষায় ছিল। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল ১ হাজার ২৭২টি মামলা। চলতি বছরের মার্চে তা কিছুটা কমে ১ হাজার ২৬৫টিতে দাঁড়ায়। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত হাইকোর্টে এসেছে ১ হাজার ৫৭৭টি মামলা, আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ১৮১টি। এই সময়ে নিষ্পত্তির পরও অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৭২৩টি।
বেঞ্চ বাড়লেও চাপ কমছে না:
এর আগে হাইকোর্টের চারটি বেঞ্চে এসব মামলার শুনানি হতো। সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত মামলার জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। ফলে এখন পাঁচটি বেঞ্চে শুনানি চলছে। আইনজীবীদের মতে, বেঞ্চ সংখ্যা বাড়ানো হলেও মামলা নিষ্পত্তির গতি প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি। তবে তারা মনে করেন, এতে ভবিষ্যতে নিষ্পত্তির হার বাড়তে পারে।
আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া:
আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে তা সরাসরি কার্যকর করা যায় না। ফৌজদারি কার্যবিধির নির্ধারিত ধারা অনুযায়ী হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হয়।
হাইকোর্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারে, বাতিল করতে পারে অথবা অন্য দণ্ড দিতে পারে। এরপর আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ থাকে। সেখানে সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে রিভিউ আবেদন করা যায়। রিভিউ খারিজ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ থাকে। সেই আবেদনও নাকচ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মামলার জটের পেছনে কারণ:
মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা বলছেন, মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করতে বিজি প্রেসের ওপর নির্ভর করতে হয়। সরকারি এই প্রেসে কাজের চাপ বেশি থাকায় অনেক সময় দেরি হয়। এতে শুনানিও পিছিয়ে যায়। তাদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নিজস্ব প্রিন্টিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে এই জট কমতে পারে। পাশাপাশি বেঞ্চ সংখ্যা ও বিচারক নিয়োগ বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে।
কনডেম সেল নিয়ে দীর্ঘ অনিষ্পত্তি:
এদিকে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দণ্ডিতদের নির্জন কক্ষে রাখার বিষয়টি নিয়েও আইনি জট রয়েছে। ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা কারাগারের তিন বন্দী এ বিষয়ে রিট করেন। ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরে ২০২৪ সালের ১৩ মে রায়ে বলা হয়, চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডের আগে দীর্ঘদিন নির্জন সেলে রাখা সংবিধান ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়, দুই বছরের মধ্যে এসব বন্দীকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ওই রায় স্থগিত করেন। এরপর নিয়মিত আপিল করা হলেও দুই বছরেও তা নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে এখনো বহু বন্দীকে নির্জন সেলেই থাকতে হচ্ছে।
আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দীর্ঘদিন নির্জন কক্ষে রাখা কার্যত অতিরিক্ত শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা মনে করছেন, বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।

