চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। আদালতের নির্দেশে পরিচালিত তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। ঘটনাটি হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও রোগী-স্বজনদের ভোগান্তির বিষয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। থানার এক উপপরিদর্শক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে বেআইনি সমাবেশ, জোরপূর্বক বাধা প্রদান, মারধর, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সড়ক পরিবহন আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে পরিচালিত তদন্তে হাসপাতাল এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্রের সক্রিয়তার অভিযোগ উঠে আসে। এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও মৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, বিকল্প অ্যাম্বুলেন্স সেবা বাধাগ্রস্ত করা এবং হাসপাতাল এলাকায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর। এসব প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, হাসপাতাল থেকে রোগী বা মরদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে স্বজনদের অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে বাইরের বৈধ অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দেওয়া, চালকদের ভয়ভীতি দেখানো এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনাও সামনে আসে।
অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গত ৮ জুন আদালত সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগগুলোর প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়ার কথা উল্লেখ করে। এরপর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিল।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৭ জুন হাসপাতালের পূর্ব গেট এলাকায় একটি মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাও তদন্তের আওতায় এসেছে। ওই ঘটনায় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী আহত হন। তদন্তে হামলার সঙ্গে হাসপাতালকেন্দ্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ পরিবহনের জন্য স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল এলাকা থেকে মরদেহ নিতে গেলে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
তদন্তে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছু ফিটনেসবিহীন যানবাহনে সাইরেন ও বিশেষ সংকেত বাতি ব্যবহার করে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে প্রতারণার পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার আসামিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে গ্রেপ্তারসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ওঠা এসব অভিযোগ সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের পরিবেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতাল এলাকায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে চলমান তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

