গোপালগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের একটি ঘটনা ঘিরে দেশের বিচারাঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আদালতের কার্যক্রম চলাকালে এক বিচারক কাচের পেপারওয়েট ছুড়ে মারেন। এতে এক শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবী আহত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বিচারালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ আদালত শুধু আইন প্রয়োগের স্থান নয়, এটি ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সেখানে বিচারক ও আইনজীবী—দুই পক্ষই বিচার ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর আগে দেশের বিভিন্ন আদালতে আইনজীবীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে বরিশালে এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল। তখনও আলোচনায় এসেছিল বার ও বেঞ্চের সম্পর্কের বিষয়টি। কারণ একজন আইনজীবী যেমন বিচারকের প্রতি সম্মান দেখাবেন, তেমনি একজন বিচারকের কাছ থেকেও প্রত্যাশা থাকে পেশাগত সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণের। তবে প্রশ্ন হলো, আদালতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলার জন্য কি বিচারকের হাতে আইনি কোনো ব্যবস্থা নেই?
বাস্তবতা হলো, বিচারকদের জন্য বিদ্যমান আইনে একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে। আদালতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিচারকরা আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। দণ্ডবিধির ২২৮ ধারায় বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে বিচারককে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননা করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। একইভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারায় আদালতের সামনে সংঘটিত অবমাননার ঘটনায় বিচারক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮২ ধারায় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।
আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণের ক্ষেত্রেও বার কাউন্সিলের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো আইনজীবীর আচরণ নিয়ে অভিযোগ থাকলে বিচারক বিষয়টি বার কাউন্সিলের নজরে আনতে পারেন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
অর্থাৎ আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু একজন বিচারক যখন আইনগত পথের পরিবর্তে শারীরিক প্রতিক্রিয়ার আশ্রয় নেন, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি এবং মানুষের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। তবে পুরো দায় কি শুধু একজন বিচারকের?
আদালতের পরিবেশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক জেলা আদালতে গরম, ভিড়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং এজলাসে অতিরিক্ত চাপ বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে।
একটি আদালতে একসঙ্গে অনেক মানুষের উপস্থিতি, মামলার চাপ এবং দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে কাজের পরিবেশ অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব সমস্যা কোনো ব্যক্তি বিশেষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি পুরো বিচার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত একটি কাঠামোগত সমস্যা। বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, বার ও বেঞ্চ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা একে অপরের সহযোগী।
একজন আইনজীবীর যেমন দায়িত্ব রয়েছে আদালতের মর্যাদা রক্ষা করার, তেমনি একজন বিচারকের দায়িত্ব রয়েছে পেশাগত আচরণ ও ধৈর্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কারণ শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরাই। কোনো কারণে বিচারকাজ ব্যাহত হলে বছরের পর বছর ধরে মামলা চালানো মানুষগুলো আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। কারও জমির বিরোধ, কারও পারিবারিক সমস্যা, কারও অধিকার আদায়ের লড়াই—সবকিছুই আটকে যায়।
তাই গোপালগঞ্জের ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বার ও বেঞ্চের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। বিচারাঙ্গনে উত্তেজনার পরিবর্তে প্রয়োজন সংলাপ ও সমাধানের পথ। অনেক সময় একটি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশও বড় ধরনের বিরোধের অবসান ঘটাতে পারে।
এখন প্রয়োজন বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সমাজের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সম্মিলিত উদ্যোগ। কারণ বিচার ব্যবস্থার যেকোনো ফাটলের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে সেই সাধারণ মানুষের ওপর, যে বছরের পর বছর ধরে একটি ন্যায্য রায়ের অপেক্ষায় থাকেন।
- লেখক: ফেরদৌস হোসেন, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
| বি: দ্র: প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব; এর দায়ভার সিটিজেন্স ভয়েস কর্তৃপক্ষ বহন করে না এবং এটি পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। |

