আজ ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার ওরিয়েন্তে প্রদেশের বিরানে জন্ম নেওয়া এই আইনজীবী ১৯৫৩ সালের ব্যর্থ সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৫৯ সালের বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত এবং প্রায় পাঁচ দশকের রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্য দিয়ে এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা আজও কিউবাকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে।
আদালতের কাঠগড়া থেকে বিপ্লবের পথে
ফিদেলের রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল আদালত ও রাজনীতির মিশ্র বাস্তবতায়। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পর তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে কিউবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫২ সালে ফুলহেনসিও বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে কাস্ত্রো সাংবিধানিক পথে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই পথ দ্রুতই তাঁকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই প্রায় ১৬০ জন বিদ্রোহীকে নিয়ে মনকাদা ব্যারাকে হামলা চালান তিনি। অভিযান ব্যর্থ হয়, কাস্ত্রো গ্রেপ্তার হন এবং বিচারের মুখোমুখি হন। আদালতে নিজের পক্ষে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যই পরে ‘হিস্ট্রি উইল অ্যাবসলভ মি’ নামে পরিচিত হয়।
কারাদণ্ডের পর ১৯৫৫ সালে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে কাস্ত্রো মেক্সিকো চলে যান। সেখানেই তিনি নতুন করে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে ‘গ্রানমা’ নৌযানে ৮২ জন যোদ্ধা নিয়ে কিউবায় ফেরেন। অবতরণের পর সরকারি বাহিনীর হামলায় অধিকাংশ যোদ্ধা নিহত বা বন্দী হলেও কাস্ত্রো, তাঁর ভাই রাউল, আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারাসহ কয়েকজন সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। পরবর্তী দুই বছরে সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালানোর পর কিউবার ক্ষমতার ভার কাস্ত্রোদের হাতে চলে আসে।
ক্ষমতায় এসে বদলে গেল কিউবার অর্থনীতি
বিপ্লবের পর কাস্ত্রোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রকে কীভাবে বদলানো হবে। তাঁর সরকার ভূমি সংস্কার, বিদেশি মালিকানাধীন সম্পদ জাতীয়করণ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পথে এগোয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও দ্রুত খারাপ হতে থাকে। ১৯৬০ সালে কিউবা মার্কিন মালিকানাধীন সম্পদ জাতীয়করণ শুরু করলে ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা নেয়; কিউবার চিনি আমদানি কমানো, সম্পদ জব্দ এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ক্রমে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অবরোধে রূপ নেয়। একই সময়ে হাভানা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
তবে কাস্ত্রোর শাসনকে শুধু অর্থনৈতিক জাতীয়করণ বা সমাজতান্ত্রিক নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়াও তাঁর সরকারের অন্যতম বড় কর্মসূচি ছিল। ১৯৬১ সালের জাতীয় সাক্ষরতা অভিযানে কয়েক লাখ মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয় এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী ওই বছরের শেষে নিরক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাতেও ১৯৬১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সাক্ষরতা অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে এসব নীতির সঙ্গে শিশু মৃত্যুহার কমা এবং শিক্ষার বছর বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতেও কিউবার পরিবর্তন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, কিউবায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার দীর্ঘ সময় ধরে কমেছে; ২০২৪ সালে এ হার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ৮ দশমিক ৬-এ দাঁড়ায়। তবে এই অর্জনকে সরাসরি শুধু কাস্ত্রোর ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং দীর্ঘ সময়ের নীতিগত ধারাবাহিকতা এর পেছনে কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতেই আন্তর্জাতিক পরিচয়
কাস্ত্রোর কিউবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত। ১৯৬১ সালে কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কিউবান নির্বাসিতদের বাহিনী বে অব পিগসে অভিযান চালায়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযান ব্যর্থ হয়। বরং এই ব্যর্থতা কাস্ত্রো সরকারের অবস্থান আরও শক্ত করে এবং হাভানাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঠেলে দেয়।
এর এক বছর পর ঘটে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। ১৯৬২ সালের অক্টোবরের সেই সংকটকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই পরাশক্তির মধ্যে পারমাণবিক সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং সংকটের অবসান ঘটে।
এই সংঘাত কাস্ত্রোর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে দুইভাবে গড়ে দেয়। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছোট একটি দেশের প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি বিপ্লবের নামে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করেছিলেন। ফলে কাস্ত্রোর ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যে প্রশ্নটি কাস্ত্রোর উত্তরাধিকারকে জটিল করে
এখানেই ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে নেতা বাতিস্তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন, তাঁর নিজের দীর্ঘ শাসনও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের প্রশ্নে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কিউবায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কাস্ত্রোর দীর্ঘ শাসনামলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বন্দিত্বের ঘটনাও ছিল।
অর্থাৎ কাস্ত্রোকে শুধু ‘বিপ্লবী নায়ক’ অথবা ‘স্বৈরশাসক’ যেকোনো একটি পরিচয়ে আটকে দিলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তাঁর সরকার এমন কিছু সামাজিক সূচকে অগ্রগতি এনেছিল, যা আজও কিউবার পক্ষে আলোচনায় আসে। আবার একই রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধিতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এই দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে সত্য হতে পারে এবং কাস্ত্রোর উত্তরাধিকার বোঝার জন্য এই দ্বৈততাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কাস্ত্রো চলে গেছেন, কিন্তু বিতর্ক শেষ হয়নি
ফিদেল কাস্ত্রো ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে মারা যান। তার আগেই তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার সরাসরি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়েন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কিউবার রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় পরিচয়ের ওপর থেকে যায়।
আর আজ, তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্তিতে সেই উত্তরাধিকার নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরও কঠিন একটি বাস্তবতার কারণে। ২০২৬ সালে কিউবা গভীর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে; দেশটিতে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি এবং শিল্প ও পর্যটনে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকার অর্থনীতিতে কিছু বাজারমুখী সংস্কারও নিচ্ছে। অর্থাৎ কাস্ত্রোর তৈরি রাষ্ট্রীয় মডেল এখন তাঁর মৃত্যুর এক দশক পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন তাই শুধু একজন মানুষের গল্প নয়; এটি একটি রাষ্ট্রকে বিপ্লবের মাধ্যমে বদলে দেওয়ার পর কী ঘটে, তারও গল্প। একজন আইনজীবী বাতিস্তার বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, পরে গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে কিউবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাঁর শাসনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে, আবার একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচনও ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিউবার অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন চাপে রেখেছে, কিন্তু কিউবার নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও বিতর্কের বাইরে নয়।
এই কারণেই ফিদেল কাস্ত্রোকে বুঝতে হলে তাঁকে শুধু নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে দেখার চেয়ে একটি প্রশ্ন করা বেশি জরুরি একটি বিপ্লব যখন রাষ্ট্র বদলে দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের মানুষ কতটা ভালো থাকে, কতটা স্বাধীন থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনের মূল্য কে দেয়? কাস্ত্রোর এক শতাব্দীর উত্তরাধিকার আজও মূলত সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে।
মিজান মাজনুন
আইনজীবী ও সাংবাদিক

