আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ নির্ধারিত সময়ে বিচারক ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাউকে না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। প্রসিকিউশনের অনুপস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে একে একে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এজলাসে উপস্থিত হলে বিচারক তাঁদের সময়ানুবর্তিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, এভাবে বিচার কার্যক্রম চলতে পারে না।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর এজলাসে বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী আসন গ্রহণ করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা একটি মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের পক্ষে আইনজীবীরাও সময়মতো আদালতে ছিলেন।
এজলাসে ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের কোনো প্রসিকিউটর তখন সেখানে ছিলেন না। ফলে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছিল না।
সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে বিচারক বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিচারক উপস্থিত, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের কেউ নেই। এরপর ট্রাইব্যুনালের কয়েকজন কর্মচারীকে প্রসিকিউশনকে বিষয়টি জানানোর নির্দেশ দেন তিনি।
এ সময় এজলাসে উপস্থিত একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা এবং ওই দিনের তালিকায় থাকা প্রথম মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর মামলার বিভিন্ন বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং নিজেদের বক্তব্য ও আবেদন উপস্থাপন করতে থাকেন।
সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে বিচারক আবারও জানান, এজলাসে যেসব কর্মচারী আসছেন, তাঁদেরই তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের খবর দিতে বলেছেন। ওই সময় তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের অনুপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এসে আদালতকক্ষ পূর্ণ করেছেন, অথচ প্রসিকিউটরদের কোনো খবর নেই।
এর কয়েক মিনিট পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম এজলাসে উপস্থিত হন। তখন আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী ট্রাইব্যুনালের প্রধান ফটকে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ নিয়ে কথা বলছিলেন।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আরও দুই আইনজীবী বি এম সুলতান মাহমুদ ও মো. মিজানুল ইসলাম এজলাসে উপস্থিত হন। তাঁদের উপস্থিতির পর বিচারক সরাসরি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে কথা বলেন এবং আদালতের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বিচারক বলেন, আদালত সকাল সাড়ে ১০টায় বসার কথা এবং তিনি নির্ধারিত সময়েই এজলাসে উপস্থিত হয়েছেন। আদালতে সময়মতো পৌঁছাতে তাঁকে নানা ধরনের অসুবিধার মধ্য দিয়ে আসতে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কোনো কোনো দিন সকালে খাওয়া-দাওয়া করার সুযোগ হয়, আবার কোনো দিন তা-ও হয় না—তারপরও তিনি সময়মতো আদালতে আসেন বলে জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সময়মতো উপস্থিত না থাকায় বিচারক অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে একটি দেশের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে না। তাঁর বক্তব্যে মূলত আদালতের কার্যক্রমের প্রতি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীলতা ও সময়ানুবর্তিতার প্রয়োজনীয়তাই উঠে আসে।
বিচারকের বক্তব্যের পর প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন দেরির জন্য ক্ষমা চান। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।
পরে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, ওই দিনের দেরির জন্য মূলত তাঁরই ভুল হয়েছে। তিনি সকালে ট্রাইব্যুনালে এসেছিলেন। তবে সাধারণত আদালতে এসে রাষ্ট্রপক্ষের প্রশাসকের কক্ষে যাওয়ার যে নিয়ম তিনি অনুসরণ করেন, সেদিন সেটি করেননি। নিজের কক্ষেই অবস্থান করছিলেন। ফলে অন্য প্রসিকিউটররা বুঝতে পারেননি যে তিনি ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে এসে গেছেন।
এই ভুলের কারণেই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের সমস্যা তৈরি হয় এবং আদালতে তাঁদের উপস্থিতি বিলম্বিত হয়েছে বলে তিনি জানান। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর হবে না বলেও বিচারককে আশ্বস্ত করেন তিনি।
আইনজীবীদের উপস্থিতি নিয়ে এই ঘটনা ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে সময়ানুবর্তিতা ও সমন্বয়ের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধের মতো স্পর্শকাতর মামলায় আদালতের প্রতিটি কার্যক্রম নির্ধারিত সময় ও প্রক্রিয়া অনুসারে পরিচালিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ, তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালতের প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তৈরি হতে পারে।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত না থাকায় যে সময়টুকু কার্যত অপেক্ষায় কেটেছে, তা শুধু একটি দিনের বিলম্ব হিসেবেই দেখার বিষয় নয়। বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং আদালতের নির্ধারিত সময় ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এ ধরনের পরিস্থিতি সম্পর্কিত। বিশেষ করে সাক্ষ্য গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শুরু করতে না পারলে আদালতের সামগ্রিক সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটার আশ্বাসের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। প্রয়োজনীয় আইনজীবীরা এজলাসে উপস্থিত হওয়ার পর রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
ঘটনার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষের অনুপস্থিতি বা বিলম্বকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আদালত নির্ধারিত সময়ে বসে এবং মামলার প্রতিটি ধাপ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তুতি ও উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই সময়মতো আদালতে উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতির পর মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। তবে দিনের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের অনুপস্থিতি নিয়ে বিচারকের প্রকাশ্য অসন্তোষ আদালতের কার্যক্রমে সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে।

