খাসকামরায় ডেকে নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কেন তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা সাত দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগের বিচার চেয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিনিধি দল। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই সাক্ষাতে সংগঠনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম ডাবলুসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অভিযোগকারী ঢাকা রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আলী।
প্রতিনিধি দলটি বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে ঘটনার বিচার দাবি করে। আইনমন্ত্রী বিষয়টি শুনে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন।
ঘটনাটি নিয়ে বিচারাঙ্গণ ও পুলিশ প্রশাসনে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বিচারকের কাছে শোকজের নোটিশ দেওয়ার খবর এলো।
ঘটনার সূত্রপাত রেলস্টেশনে
মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লিখিত অভিযোগ ও এসআই মোহাম্মদ আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মা সেতুগামী শহরতলী রেলওয়ের প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। তখন নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারকের অফিস সহকারী সাকিব আল হাসানের ব্যাগ তল্লাশি করতে চান দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশের অভিযোগ, সাকিব ব্যাগ তল্লাশিতে বাধা দেন এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তাঁকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রেলওয়ে থানায় নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য, থানায় প্রথমে নিজের পরিচয় না দিলেও পরে সাকিব নিজেকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর পিয়ন হিসেবে পরিচয় দেন। মোবাইল ফোনে বিচারকের সঙ্গে কথা বলে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টির সেখানেই নিষ্পত্তি করা হয়।
তবে এসআই মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, থানা থেকে বের হওয়ার সময় সাকিব তাঁকে ‘আদালতে দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন। পরে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান এবং ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
এরপর তলব, তারপর মারধরের অভিযোগ
এর ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে এসআই মোহাম্মদ আলীকে তলব করেন ঢাকা রেলওয়ে থানার আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে বিচারক শাহিদুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর গত মঙ্গলবার দুপুরে এসআই মোহাম্মদ আলী ওই আদালতে গেলে তাঁকে খাসকামরায় নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
লিখিত অভিযোগে এসআই মোহাম্মদ আলী বলেন, আদালতের কক্ষে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে সেখানে বসে আছেন। পরে বিচারকের স্টাফসহ মোট তিনজন সেখানে অবস্থান করেন এবং কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তাঁর অভিযোগ, একপর্যায়ে আদালতের ওমেদার হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি পেছন থেকে তাঁকে আঘাত করেন এবং এলোপাতাড়ি মারধর করেন। ঘটনাটি সেখানে থাকা একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এসআই মোহাম্মদ আলীর দাবি, ঘটনার সময় বিচারক তাঁকে ‘তুই-তামারি’ করে ধমক দেন। বিচারক তাঁর কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা চাইতেও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, বিচারক বিষয়টি আমলে না নিয়ে পিয়ন সাকিব আল হাসানের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মারধর ও অপমান করিয়েছেন।
পিয়নের বক্তব্য ভিন্ন
তবে পুলিশের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন আদালতের পিয়ন সাকিব আল হাসান।
সাকিবের বক্তব্য অনুযায়ী, কমলাপুরে ট্রেন থেকে নামার সময় একজন কনস্টেবলসহ কয়েকজন তাঁর কাঁধে থাকা ব্যাগে হাত দেন। তিনি তাঁদের সামনে ব্যাগ তল্লাশির অনুরোধ করেন। পরে নিজের পরিচয় আদালতের স্টাফ হিসেবে দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাকিবের দাবি, ঘটনার বিষয়ে জানাতে তিনি রেলওয়ে থানায় গেলে এসআই মোহাম্মদ আলী তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। সেখানে তাঁকে চড়-থাপ্পড় মারা হয় এবং বিচারকের সঙ্গে ফোনে খারাপ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অর্থাৎ, একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ কর্মকর্তা ও আদালতের কর্মচারী—দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে মারধর ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন।
এখন তদন্তের অপেক্ষা
ঘটনার বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে খাসকামরায় পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কী ঘটেছিল, কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কথিত মারধরের ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের শোকজে বিচারককে সাত দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী তদন্তপ্রক্রিয়ার ওপর।
একই সঙ্গে ঘটনাটি বিচার বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব, পেশাগত আচরণ এবং ক্ষমতার সীমা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিচারকের খাসকামরায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে ডেকে নেওয়া এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে—এই বিষয়গুলোই এখন তদন্তের কেন্দ্রে থাকবে।

