জাতিকে এগিয়ে নিতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতি অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
শুক্রবার বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা-২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য জ্ঞানের বিকাশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিএনপিকে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিতেও জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আয়োজকদের উদ্দেশে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জিয়া স্মৃতি বইমেলা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
আলোচনায় জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর অনেকটাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, সে সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে দ্বিধায় থাকলেও জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ওই সময়ে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল। তার দাবি, জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়েছিলেন। এ সময় কেরানীগঞ্জের সিদ্দিক মাস্টার গুমের শিকার হন এবং সিরাজ শিকদার বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সংসদে দেওয়া ‘কোথায় আজ সিরাজ শিকদার’ বক্তব্যেরও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী।
তবে এসব ঐতিহাসিক ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে এসব বক্তব্য তুলে ধরেন।
‘জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন’
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই সময় দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল এবং সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। তাঁর দাবি, জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব ক্ষেত্রে আবার সুযোগ তৈরি হয় এবং মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়নের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, দলটির ৭০০-এর বেশি নেতাকর্মী গুম হয়েছেন এবং ৬০ লাখের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী দাবি করেন, ওই আন্দোলনে এই প্রজন্মের ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের ঘোষিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে ছাত্রদলকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানকে ‘জাতিসত্তার রূপকার’ বললেন কাদের গনি
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের ‘জাতিসত্তার রূপকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরে জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের একমাত্র ‘স্টেটসম্যান’। তাঁর দাবি, স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে জিয়াউর রহমান দেশকে একটি নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
কাদের গনি চৌধুরীর ভাষ্য, জিয়াউর রহমানের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে কৃষি, শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর আমলে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে বলে তিনি দাবি করেন।
জিয়াউর রহমানের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।
বহুদলীয় রাজনীতি নিয়ে দাবি
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার পরপরই গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল এবং সে সময় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
তিনি দাবি করেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৬ সালের ‘রাজনৈতিক দল বিধি’-এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
কাদের গনি চৌধুরী আরও বলেন, জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে রাজধানী বা প্রাসাদকেন্দ্রিক না রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিএনপির জনপ্রিয়তার পেছনে জনগণের সঙ্গে দলের যোগাযোগ এবং গণমুখী কর্মকাণ্ড ভূমিকা রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের সহসভাপতি সাইদুর রহমান মিন্টুর সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

