গ্রাহকদের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রীর নামে থাকা অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত এই আদেশ জারি করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের সম্ভাব্য অবৈধ সম্পদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য শিগগিরই আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা অনুরোধ পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করেছিলেন। আদালত তার পর্যালোচনায় উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের নামে অস্বাভাবিক বেশি দামে জমি কিনে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ একাধিক দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
অনুসন্ধানে এটাও উঠে আসে যে, উল্লিখিত সম্পত্তি অবিলম্বে ক্রোক না করা হলে তা হস্তান্তর বা পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিবেচনায় ঢাকাসহ দেশের একাধিক জেলার ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়কে ক্রোককৃত সম্পত্তি কোনোভাবেই হস্তান্তর বা লেনদেন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুদকের ঢাকাস্থ একটি সমন্বিত কার্যালয়ে ইতিমধ্যে একাধিক পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে, যা ২০২২ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছে। গত বছরের শেষদিকে একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যেখানে তিনি নিজের নামে থাকা বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের তথ্য স্বীকার করেন বলে জানা গেছে।
আদালতের আদেশে দুটি পৃথক তালিকায় দম্পতির নামে অর্জিত সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের নামে রাজধানীর উত্তরা, গুলশানসহ ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা কয়েক ডজন দলিলের সম্পত্তি রয়েছে, যার দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গুলশানে একটি বাড়িসহ জমি, কুয়াকাটায় বিস্তৃত এলাকাজুড়ে জমি এবং উত্তরায় একটি প্লট।
অন্যদিকে তার স্ত্রীর নামে গুলশান, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্টসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং গাজীপুরে থাকা সম্পত্তির দাপ্তরিক মূল্য প্রায় ১৯ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও একটি ভবন। দুজনের নামে থাকা মোট সম্পত্তির দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য প্রায় ৫৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বর্তমান বাজারদরে তার প্রকৃত মূল্য আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের ভেতরের সম্পত্তির বাইরেও অভিযুক্ত দম্পতির বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বীমা খাতে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বহু বছর ধরে সঞ্চিত অর্থ হারানো গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে অভিযুক্তদের সম্পদ উদ্ধার প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে ভুক্তভোগীদের প্রকৃত প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা।

