বিচার ব্যবস্থা এখন কাগজ কলম থেকে স্ক্রিনের দিকে যাচ্ছে, অফলাইন থেকে অনলাইন হচ্ছে। ই-কোর্ট, অনলাইন কার্যতালিকা, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, এসব নাম এখন পরিচিত হয়ে উঠছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে শুরু করে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়েন, ফিলিপাইন্স সহ অনেক দেশে ই জুডিসিয়ারি ব্যবস্থা ব্যপক প্রচলিত। বিশেষভাবে কোভিডের সময় এর প্রয়োজনীয়তা আর ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশও এই যাত্রায় হাঁটা শুরু করছে ধীরে ধীরে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- বাংলাদেশের আইনি কাঠামো কি প্রস্তুত? বিচারক ও আইনজীবীরা কি প্রস্তুত? সাধারণ মানুষ কি এই সুবিধা পাচ্ছে?
এই প্রতিবেদনে তিনটি দিক দেখা হবে; আইনি ভিত্তি, বিদ্যমান সমস্যা, এবং অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ।
আইনি ভিত্তি কী বলে
ডিজিটাল প্রমাণের স্বীকৃতি একেবারে নতুন বিষয় না। এভিডেন্স অ্যাক্ট, ১৮৭২-এ সংশোধনী এনে ২০২২ সালে ৬৫এ ও ৬৫বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী কম্পিউটার থেকে তৈরি বা সংরক্ষিত তথ্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে আদালতে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়। আগে মূল নথি বা ডিভাইস হাজির করতে হতো। এখন একটি সার্টিফিকেট দিয়েই কাজ চলে।
তবে এই সার্টিফিকেট পদ্ধতি নিয়ে আইনি গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বের অনেক দেশ এখন সার্টিফিকেটকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে না রেখে বেশি নমনীয় পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ এখনো ভারত ও জাঞ্জিবারের মতো কঠোর সার্টিফিকেট-নির্ভর মডেল অনুসরণ করছে।
আরেকটি স্তম্ভ পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩। এই আইনের অধীনে ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালু হয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণের মামলা এখন অনলাইনেও চলে।
এখন পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগ
সরকার একসাথে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। ই-কোর্ট সিস্টেমে কেস নম্বর দিয়ে মামলার অবস্থা, শুনানির তারিখ, আদেশ দেখা যায়। myCourt অ্যাপে মোবাইল থেকেই এসব তথ্য পাওয়া যায়। ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন কজলিস্ট, এবং বিবাহ-তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালাইজেশন চলছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম, দুটি জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট পুরোপুরি কাজ করছে। পারিবারিক মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি এখানে অনলাইনে হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ভার্চুয়াল আদালত চালুর কাজও শুরু হয়েছে, যাতে দূরত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে।
এই অগ্রগতি ভালো, কিন্তু সীমিত। সারা দেশের সব আদালতে, সব ধরনের মামলায় এখনো এই সুবিধা পৌঁছায়নি।
বড় সমস্যা কোথায়
স্পষ্ট নীতিমালার অভাবঃ আইন ও বিচার বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন “ভার্চুয়াল শুনানি টেকসই করতে স্পষ্ট নীতিমালা, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর, এবং ডিজিটাল প্রমাণের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এখনো প্রয়োজন।”
সমন্বয়ের ঘাটতি: পুলিশ, ফরেনসিক ল্যাব, আদালত, এবং বার কাউন্সিলের মধ্যে ডিজিটাল সংযোগ পূর্ণাঙ্গ নয়। একটি ডিজিটাল প্রমাণ থানা থেকে ফরেনসিক ল্যাব হয়ে আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে এখনো কাগজি প্রক্রিয়া লাগে।
সার্টিফিকেট–নির্ভরতার জটিলতা: ৬৫বি ধারার সার্টিফিকেট পেতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান লাগে। ছোট শহরের আইনজীবী বা সাধারণ বিচারপ্রার্থীর কাছে এই প্রক্রিয়া কঠিন মনে হয় এবং জ্ঞানের অভাব বিদ্যমান।
প্রশিক্ষণের অভাব: বিচারক ও আইনজীবীদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল টুল ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নন। প্রযুক্তি থাকলেও ব্যবহারকারী প্রস্তুত না হলে সুফল মেলে না।
অবকাঠামো বৈষম্যঃ ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের আদালতে ইন্টারনেট ও যন্ত্রপাতি উন্নতমানের। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের আদালতে বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান।
তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাঃ মামলার নথি, পারিবারিক তথ্য, সাক্ষীর পরিচয়; এসব ডিজিটাল সিস্টেমে গেলে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন আসে।
অন্য দেশ কীভাবে এগিয়েছে
ভারতের e-Courts Mission Mode Project ২০০৭ সালে শুরু হয়ে এখন তৃতীয় পর্যায়ে (২০২৩-২০২৭) আছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সোয়া কোটির বেশি মামলা ই-ফাইলিং প্ল্যাটফর্মে দাখিল হয়েছে, এবং ৪ কোটি ১৮ লাখের বেশি রিমোট শুনানি হয়েছে। দেশজুড়ে ২৫টি হাইকোর্টে ই-ফাইলিং নিয়ম কার্যকর হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন e-Sewa Kendra। এগুলো আদালত চত্বরে বসানো সহায়তা কেন্দ্র, যেখানে সাধারণ মানুষ ই-ফাইলিং, ই-পেমেন্ট, মামলার স্ট্যাটাস, সব কিছুতে সহায়তা পান। এভাবে যাদের ডিজিটাল দক্ষতা কম, তারাও সুবিধা থেকে বাদ পড়েন না।
সিঙ্গাপুর: বাধ্যতামূলক ই–লিটিগেশন
সিঙ্গাপুরে eLitigation সিস্টেম ব্যবহার এখন বাধ্যতামূলক। সিঙ্গাপুরের যেসব ল ফার্ম এই সিস্টেমে সাবস্ক্রাইব করেছে, তারা সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমেই মামলা পরিচালনা ও ফাইলিং করতে পারে। কাউন্টারে কাগজ জমা দেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই। কোভিড মহামারির সময় প্রণীত সাময়িক আইনের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির অনুমোদনে জুমের মতো প্ল্যাটফর্মে শুনানি নেওয়ার বৈধতা দেওয়া হয়।
ছোট দাবি, কর্মসংস্থান বিরোধ, এবং হয়রানি থেকে সুরক্ষার মামলার জন্য আলাদা অনলাইন টুল আছে, যার নাম Community Justice and Tribunals System। এখানে একটি ই-নেগোসিয়েশন সুবিধাও আছে, যেখানে দুই পক্ষ নিজেরাই আলোচনা করে আদালতের আদেশ পেতে পারে, প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায়ও।
যুক্তরাজ্য: ধাপে ধাপে সংস্কার
যুক্তরাজ্যের HMCTS Online Civil Money Claims সেবা এখন সম্পূর্ণ অনলাইন সেবা দেয়। ২০২৬ সালের মধ্যে এই সেবার মাধ্যমে দশ লাখের বেশি দাবি প্রক্রিয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় প্রথম শুনানি পর্যন্ত পৌঁছাতে গড়ে ৪৪ সপ্তাহ লাগে, কাগজি প্রক্রিয়ায় যা ৫৩ সপ্তাহ ছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো ১০ হাজার পাউন্ডের নিচে বিতর্কিত দাবির ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগে বিনামূল্যে এক ঘণ্টার মধ্যস্থতা সেশনে বসা বাধ্যতামূলক। এতে অনেক মামলা শুনানি পর্যন্ত না গিয়েই মিটে যায়।
তবে যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা এটাও দেখায় যে সব মামলা ডিজিটাল করা যায় না। কিছু নির্দিষ্ট ধরনের দাবি এখনো কাগজনির্ভর প্রক্রিয়ায় থেকে গেছে, কারণ পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রযুক্তিগত জটিলতা বেশি।
বাংলাদেশের জন্য কী শেখার আছে
ভারতের e-Sewa Kendra মডেল অনুসরণ করে প্রতিটি জেলা আদালতে একটি সহায়তা ডেস্ক বসানো যায়। এতে যাদের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট জ্ঞান কম, তারাও ডিজিটাল সেবা পাবেন। এবার, যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা বলে, ছোট ও সরল মামলা (যেমন অর্থ দাবি, পারিবারিক মামলা) দিয়ে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। জটিল ফৌজদারি মামলা পরে যুক্ত করা যায়।যুক্তরাজ্যের মতো ছোট দাবির ক্ষেত্রে শুনানির আগে অনলাইন মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক করলে আদালতের ওপর চাপ কমবে।
ডিজিটাল প্রমাণের সার্টিফিকেট পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও মানসম্মত টেমপ্লেট আকারে করা দরকার, যাতে ছোট শহরের আইনজীবীও সহজে ব্যবহার করতে পারেন।
এখন কী করতে হবে
- ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও উপস্থাপনার জন্য একটি সুস্পষ্ট এসওপি জারি করতে হবে।
- পুলিশ, ফরেনসিক ল্যাব ও আদালতের ডেটাবেজ একে অপরের সাথে যুক্ত করতে হবে।
- প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিচারক ও আইনজীবীদের জন্য নিয়মিত ডিজিটাল প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
- উপজেলা পর্যায়ের আদালতে ইন্টারনেট সংযোগ ও ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
- আলাদা তথ্য সুরক্ষা আইন পাস করে মামলার নথি ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- সহায়তা ডেস্ক বসিয়ে যাদের ডিজিটাল দক্ষতা কম, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
- ই-ফ্যামিলি কোর্টের সফলতা মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে অন্য আদালতে সম্প্রসারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ এভিডেন্স অ্যাক্টে সংশোধনী এনে ডিজিটাল প্রমাণকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। ই-ফ্যামিলি কোর্ট, myCourt অ্যাপ, ই-কোর্ট সিস্টেম চালু করে প্রশাসনিক কাজ সহজ করেছে। এই শুরুটা ইতিবাচক। বাংলাদেশের আদালত এখন সেই মধ্যবর্তী পথে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে সামনের কয়েক বছরই ঠিক করে দেবে এই যাত্রা কতদূর এগোয়।

