বিশেষ বিশ্লেষণ
একটা সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। ধরুন একজন মহাজন এলাকার কয়েকজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে জরুরি দরকারে চড়া সুদে টাকা ধার দিলেন, কারণ তারা আর কোথাও থেকে টাকা পাচ্ছিলেন না। বছর শেষে দেখা গেল, মহাজনের আয় আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি আয়টা কি মহাজনের ব্যবসায়িক দক্ষতার প্রমাণ, নাকি এলাকার ব্যবসায়ীদের সংকটেরই প্রতিফলন? বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা নিট মুনাফার গল্পটাও অনেকটা এইরকম। মোট আয় হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা, খরচ ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা, আর আগের অর্থবছরের ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকার তুলনায় মুনাফা বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এই টাকার প্রায় পুরোটাই যাচ্ছে সরকারের কোষাগারে, আর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাচ্ছেন ছয় মাসের মূল বেতনের সমান বোনাস। কিন্তু এই লেখায় আমি মুনাফার অঙ্কে না গিয়ে একটা ভিন্ন সংখ্যায় মনোযোগ দিতে চাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মুনাফার কত শতাংশ নিজের কাছে রাখল, আর কত শতাংশ সরকারকে দিয়ে দিল। এই একটা অনুপাতই বলে দেয় একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিণত, আর বাংলাদেশ ব্যাংক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।
মুনাফাটা আসলে কার সংকট থেকে তৈরি হলো
আগে দেখে নেওয়া যাক টাকাটা এলো কোথা থেকে, কারণ উৎস না জানলে অনুপাতের গুরুত্ব বোঝা যাবে না। ব্যাংক খাতের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ও দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখতে পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ও বিশেষ তারল্য সুবিধার আওতায় দেওয়া এই ধারের সুদ থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা বড় আয় এসেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে উঁচু নীতি সুদহারের প্রভাব। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সারা বছর সুদহার চড়া রাখায় ব্যাংকগুলোকে বেশি সুদ গুনতে হয়েছে, আর সরকারও রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বেশি ঋণ নেওয়ায় ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে সুদ আয় বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেও ভালো আয় হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক সুদহার এখনো তুলনামূলক উঁচু। তিনটি উৎসই একটা জিনিস স্পষ্ট করে দেয়, এই মুনাফা কোনো নতুন উৎপাদনশীলতা বা দক্ষতার ফসল নয়, বরং অর্থনীতির চাপ ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর অসহায়ত্ব থেকে তৈরি একটা উপজাত। মহাজনের গল্পে যেমন, এখানেও তেমন; আয় বাড়া মানেই সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
আইন কোথাও বলেনি মুনাফা করতে হবে
এখানে একটা আইনি বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারকে নীতি পরামর্শ দেওয়া, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পরিশোধব্যবস্থা তৈরি এবং ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকি করা। এই তালিকার কোথাও মুনাফা অর্জনের কথা নেই, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই মুনাফা বাড়াটাকে সাফল্য হিসেবে দেখানোর আগে ভাবা দরকার, উল্টো পরিস্থিতিও ঘটতে পারত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ালে বা টাকার দরপতন ঠেকাতে ডলার বিক্রি করলে আয় বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সংকটাপন্ন ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ নিজের কাঁধে তুলে নিলে বা স্বল্প সুদে জরুরি সহায়তা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোকসানও হতে পারে। আর সেটাই হয়তো অর্থনীতির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ মুনাফা আর নীতিগত সাফল্য একে অপরের সমার্থক নয়। এই জায়গা থেকেই আসল প্রশ্নটা তৈরি হয়; মুনাফা যখন হয়েই গেল, তখন সেটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করল?
যে অনুপাতটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না
এখানেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনাটা কাজে লাগে, তবে দেশ ধরে ধরে নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে; মুনাফার কত অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের কাছে রাখল। বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রায় শতভাগ মুনাফা সরকারকে দিয়ে দিয়েছে, নিজের জন্য কার্যত কিছুই রাখেনি। পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকও প্রায় একই পথে হেঁটেছে, ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি রুপি মুনাফার মধ্যে ১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ কোটি রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ সরকারকে দিয়েছে, যদিও নীতি সুদহার সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ থেকে নেমে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে আসায় তাদের মুনাফা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এর বিপরীতে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে দিয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮৮ কোটি রুপি, কিন্তু এটা দেওয়ার আগে তারা নিজেদের ঝুঁকি সঞ্চিতি তহবিলে সরিয়ে রেখেছে ১ লাখ ৯ হাজার ৩৮০ কোটি রুপি; আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ। এই সঞ্চিতি রাখাটা কোনো ইচ্ছাধীন সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতের ইকোনমিক ক্যাপিটাল ফ্রেমওয়ার্কের একটা বাধ্যতামূলক নিয়ম, যেখানে ব্যালান্স শিটের সাড়ে চার থেকে সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকি বাফার রাখতেই হয়। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তো আরও এক ধাপ এগিয়ে; ২০২৫ সালে তাদের মুনাফা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কমলেও তারা মোট মুনাফার মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ সরকারকে দিয়েছে, বাকি প্রায় ৭৮ শতাংশ নিজেদের রিজার্ভ ও মূলধন শক্তিশালী করতে রেখে দিয়েছে। একই ঘটনার চারটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া আর এই পার্থক্যটাই বলে দেয় কোন প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে ভাবছে, আর কোনটা শুধু বর্তমানের চাপ সামলাতে ব্যস্ত।
কেন এই অনুপাতটাই আসল গল্প
এখানে আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সেফগার্ডস অ্যাসেসমেন্ট নীতিমালা ও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং চর্চা একটা বিষয়ে একমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা টিকে থাকে তার নিজের মূলধন-ভিত্তির ওপর, শুধু সরকারকে খুশি রাখার সক্ষমতার ওপর নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই মুহূর্তে যে পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দিয়ে বসে আছে, তার বিপরীতে ভবিষ্যতে সেই ঋণ ফেরত না এলে কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায় হাতে তেমন কোনো বাড়তি বাফার নেই। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি যখন বড়, তখন পুরো মুনাফা কোষাগারে চলে যাওয়াটা স্বল্পমেয়াদে স্বস্তিদায়ক মনে হতেই পারে, কিন্তু এটা এক ধরনের ধারকর্জ করে আজকের বাজেট সামলানোর মতো। আগামীকালের সমস্যাটা শুধু পিছিয়ে দেওয়া হলো, সমাধান হলো না। ভারত ও শ্রীলঙ্কা যেটা করেছে, সেটা মূলত একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর; আগে নিজের ভিত মজবুত করো, তারপর যা বাড়তি থাকে সেটা ভাগ করো। বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছে বলেই মনে হয়।
তাহলে খবরের শিরোনামটা আসলে কী হওয়া উচিত ছিল
শেষ কথা হলো, “বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা” শিরোনামটা যতটা চমকপ্রদ শোনায়, ততটা তথ্যবহুল নয়। প্রকৃত খবরটা হওয়া উচিত ছিল, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট এত গভীর যে তাদের দেওয়া জরুরি সহায়তার সুদ থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ আসছে, অথচ সেই সংকটের বিপরীতে কোনো বাড়তি সঞ্চিতি না রেখে পুরো টাকা সরকারকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাফল্য মাপার আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা কমল কি না, আমানতকারীর টাকা কতটা নিরাপদ থাকল, আর ভবিষ্যতের ধাক্কা সামলানোর মতো নিজস্ব সঞ্চিতি কতটা তৈরি হলো। মুনাফার অঙ্কটা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না, বরং আরও গভীর একটা প্রশ্ন তুলে দেয়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

