ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে, দুই হিন্দুর মধ্যে বৈধভাবে হওয়া বিয়ে শুধু একটি স্ট্যাম্প পেপারে একতরফা ঘোষণা দিয়ে বাতিল করা যায় না। এই ধরনের বিয়ে ভাঙতে হলে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টে বলা পথেই যেতে হবে।
আদালতের লখনউ বেঞ্চে মামলাটি শোনেন বিচারপতি সুভাষ বিদ্যার্থী। এক স্বামী ফ্যামিলি কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেছিলেন। ফ্যামিলি কোর্ট তাঁকে প্রতি মাসে স্ত্রীকে ২ হাজার ২০০ রুপি ভরণপোষণ দিতে বলেছিল।
ঘটনা কী ছিল
স্বামীর দাবি ছিল অন্যরকম। তিনি বলেন, স্ত্রী ভরণপোষণ চাওয়ার প্রায় ১৪ বছর আগেই স্থানীয় রীতিতে দুজনের সম্মতিতে বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। এই দাবির পক্ষে তিনি আদালতে ২০০৫ সালের একটি কাগজ দেখান। সেটি ছিল ১০ রুপির স্ট্যাম্প পেপারে লেখা একটি বিবাহবিচ্ছেদের চুক্তি।
আদালত কাগজটি খুঁটিয়ে দেখে। দেখা যায়, এটি একতরফাভাবে লেখা। স্বামী নিজে এতে পক্ষ হিসেবে সই করেননি, শুধু সাক্ষী হিসেবে সই করেছিলেন। কয়েকজন মানুষ সাক্ষী হিসেবে ছিলেন বটে, তবে এটি আইনসম্মত কোনো বিবাহবিচ্ছেদ নয়।
আদালতের বক্তব্য
হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, হিন্দু বিয়ে ভাঙার একটাই বৈধ পথ, হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট। আদালতের ডিক্রি ছাড়া অন্য কোনো কাগজ, তা যত সাক্ষীই থাকুক না কেন, আইনের চোখে বিবাহবিচ্ছেদ নয়। তাই স্বামী যে চুক্তির ওপর ভরসা করেছিলেন, তার কোনো আইনি মূল্য নেই। স্ত্রী তাই এখনো আইনগতভাবে তাঁরই স্ত্রী, এবং ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারও তাঁর আছে।
দ্বিতীয় বিয়ে আর সন্তান
শুনানিতে স্বামী নিজেই স্বীকার করেন, ২০০৮ সালে তিনি অন্য এক নারীকে বিয়ে করেছেন। সেই সংসারে সন্তানও হয়েছে। আদালত বলে, প্রথম বিয়ে তখনো আইনগতভাবে বহাল ছিল। সেই অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করাটাই স্ত্রীর আলাদা থাকার যথেষ্ট কারণ।
স্বামীর আইনজীবী একটি পুরোনো রায়ের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, বিনা কারণে আলাদা থাকলে স্ত্রী ভরণপোষণ পান না। আদালত বলে, নীতিগতভাবে এটা ঠিক কথা, কিন্তু এই মামলায় কারণ ছিল স্পষ্ট, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে।
১৪ বছর দেরির প্রশ্ন
স্বামী আরেকটি যুক্তি দিয়েছিলেন, এত বছর পর ভরণপোষণ চাওয়া উচিত নয়। আদালত জানায়, আইনে এমন কোনো সময়সীমা লেখা নেই। স্ত্রী আগে ২০১১ সালেও আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ভাইয়ের মৃত্যুর ধাক্কায় মামলা এগিয়ে নিতে পারেননি। পরে আবার আবেদন করেন। আদালত এতে কোনো সমস্যা দেখেনি।
রায়ের শেষ কথা
হাইকোর্ট স্বামীর আবেদন খারিজ করে দেয়। ফ্যামিলি কোর্টের ভরণপোষণের আদেশ বহাল থাকে। মামলাটির নাম বিনোদ কুমার ওরফে সন্ত রাম বনাম শ্রীমতী শিব রানী। রায় দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ৫ মার্চ, ক্রিমিনাল রিভিশন নম্বর ১৯১।
বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ কীভাবে হয়
ভারতে এই মামলা দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশে হিন্দুদের বিবাহবিচ্ছেদ কীভাবে হয়। উত্তরটা একটু অন্যরকম।
বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা কোনো বিবাহবিচ্ছেদ আইন নেই। ভারতে যেমন ১৯৫৫ সালের হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট আছে, বাংলাদেশে তেমন কোনো আইন কার্যকর নয়। এখানে হিন্দু বিয়ে চলে দায়ভাগ প্রথা অনুসারে, যেখানে বিয়েকে ধরা হয় একটি চিরস্থায়ী পবিত্র বন্ধন হিসেবে। তাই শাস্ত্রীয় অর্থে তালাক বা বিচ্ছেদের কোনো সুযোগই এখানে নেই।
২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন এসেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটি শুধু বিয়ের নিবন্ধন নিয়ে, বিচ্ছেদ নিয়ে নয়। ফলে একজন হিন্দু নারী চাইলেও আইনি উপায়ে সহজে স্বামীর কাছ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেন না।
তবে পুরো পথ বন্ধ নয়। ১৯৪৬ সালের একটি পুরোনো আইন আছে, দ্য হিন্দু ম্যারিড ওম্যানস রাইট টু সেপারেট রেসিডেন্স অ্যান্ড ম্যাইন্টেন্যান্স অ্যাক্ট। এই আইনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ দেখাতে পারলে একজন স্ত্রী স্বামীর থেকে আলাদা বসবাস করতে পারেন এবং ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। কিন্তু এটি বিবাহবিচ্ছেদ নয়, শুধু আলাদা থাকার অধিকার।
এর ফল ভোগ করেন মূলত নারীরা। বিয়ে আইনত না ভাঙায় তাঁরা চাইলেও নতুন করে বিয়ে করতে পারেন না। সমাজে বিচ্ছিন্ন থাকা নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক সময় নেতিবাচক থাকে।
এই শূন্যতা দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠছে, বাংলাদেশেও একটি হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ আইন হওয়া উচিত। আইন কমিশনও হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার নিয়ে সুপারিশ দিয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো আইন পাস হয়নি, তাই বাংলাদেশের হিন্দু দম্পতিদের জন্য আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়ার পথ এখনো খোলা নেই।

