একজন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকে—কিন্তু এগিয়ে এলেন না কেউ। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে দৃশ্যটি ধারণ করলেন, কিন্তু বাধা দেওয়ার সাহস দেখালেন না কেউই। পুলিশকে খবর দেওয়ার তাগিদও অনুভব করেননি উপস্থিত জনতার কেউ। এই ঘটনাকে ঘিরে সমাজের বিবেক ও মানবিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
বুধবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তিনি কক্সবাজারের মহেশখালীতে গাছে বেঁধে ফয়সাল নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি নিহত ব্যক্তি এবং তার চার বছরের শিশুর ছবিও যুক্ত করেন। একজন মানুষের জীবন এভাবে কেড়ে নেওয়ার দৃশ্যের সামনে সাধারণ মানুষের এই নিষ্ক্রিয়তা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার প্রশ্ন—মানুষের বিবেক কি এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও আর অবশিষ্ট নেই?
লেখায় তিনি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত থেকে নীরব দর্শকের ভূমিকা নেওয়া ব্যক্তিদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কারও অপরাধ বা দায় নির্ধারণের এখতিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের—জনতার নয়। তার মতে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই প্রতিটি পক্ষের ভূমিকা নিরূপণ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলেও তাকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। কেউ প্রকৃতপক্ষে অপরাধী কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্বও উত্তেজিত জনতার হাতে দেওয়া যায় না। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের হাতে তুলে দেওয়াই সঠিক পথ, শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র রাষ্ট্রের বিচারিক প্রতিষ্ঠানের। তার ভাষায়, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
আইনজীবী তাজুল ইসলাম তার লেখায় প্রশ্ন তোলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষেরা কি একবারও ভেবেছিলেন তারা কতটা ভয়াবহ একটি অন্যায়ের সাক্ষী হচ্ছেন? চোখের সামনে একজন মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে দেখেও কেন অন্তত দু-একজন প্রতিবাদে এগিয়ে এলেন না, কেন কেউ পুলিশকে খবর দিলেন না বা সাহায্যের চেষ্টা করলেন না—এই প্রশ্নগুলোই তিনি সামনে আনেন। তার কাছে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক মনে হয়েছে এই বিষয়টি যে, যখন একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা হওয়া প্রয়োজন ছিল, তখন কেউ কেউ ব্যস্ত ছিলেন সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে।
তবে তিনি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের কথাও উল্লেখ করেন—প্রত্যক্ষদর্শী প্রত্যেকের পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সক্ষমতা এক নয়, তাই কারও দায় নির্ধারণের আগে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক।
তার মতে, এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের প্রশ্ন নয়, বরং এটি সমাজের সামগ্রিক মানবিক মূল্যবোধ নিয়েই একটি গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জনসম্মুখে একজন মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, আর আশপাশের মানুষ তা মোবাইলে ধারণ করছে—এই বাস্তবতা সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অপরাধের দৃশ্য ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়া বা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকার প্রবণতা যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবিকতার জায়গাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এই প্রশ্নও তিনি রাখেন পাঠকের সামনে।
লেখার শেষ ভাগে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যেমন ভয়ংকর, তেমনি অপরাধের সামনে নীরব দর্শক হয়ে থাকাও সমাজের জন্য কম উদ্বেগজনক নয়। একটি সভ্য সমাজে বিচার হওয়া উচিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই এবং বিচারিক পদ্ধতির মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত কার কতটা দায়। এই ঘটনাতেও তিনি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানান, যাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা স্পষ্ট হয় এবং প্রমাণিত দায়ের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সবশেষে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখেন সমাজের সামনে—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে অন্যায় দেখেও মানুষ নীরব থেকে যাবে এবং মৃত্যুর দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করবে, নাকি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে বিপদে একজন মানুষ আরেকজনের পাশে দাঁড়াবে, প্রতিবাদ করবে এবং অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দেবে? তার ভাষায়, এই প্রশ্ন এখন কেবল প্রশাসনের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের—কারণ একটি সমাজের মানবিকতা কেবল আইন-আদালতের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সাধারণ মানুষের বিবেক, সাহস ও দায়িত্ববোধের ওপরও।
সামাজিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই ধরনের ঘটনা এবং তার প্রতি সমষ্টিগত নিষ্ক্রিয়তা একটি সংকেত দেয়—আইনের প্রতি আস্থা কমে গেলে বা ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া দুর্বল মনে হলে মানুষ নিজেই বিচারক হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে এই ধরনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করাই কেবল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

