সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজও আদালতে জমা পড়েনি। ফলে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৫ নভেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। এ নিয়ে আলোচিত এই মামলার প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছাল ১৩০ বার। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৪ বছর পরও কেন এই নৃশংস ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়নি, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এল।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তাই আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় এই সাংবাদিক দম্পতি নৃশংসভাবে খুন হন। সাগর সরওয়ার তখন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। দুজনেরই পরিচিতি ছিল দেশের গণমাধ্যমে।
ঘটনার পর রুনির ভাই নওশের আলম রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা-পুলিশ। পরে তদন্তভার যায় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হাতে। এরপর দায়িত্ব পায় র্যাব। ঘটনার এক যুগ পর মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআইকে। গত বছরের নভেম্বরে র্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় সংস্থাটি।
অর্থাৎ চার দফায় চারটি সংস্থার হাতে ঘুরেছে এই মামলার তদন্ত। তবু আজ পর্যন্ত হত্যার কারণ বা হত্যাকারীদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসেনি। এর আগেও একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মামলার বড় একটি সময় কার্যত কোনো তদন্তই হয়নি।
এই মামলার দীর্ঘসূত্রতা কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, তারিখ পেছানোর সংখ্যাটাই একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। ১৩০ বার প্রতিবেদন জমার সময় পিছিয়ে যাওয়া মানে তদন্ত প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির গুরুতর ঘাটতি। আদালত বারবার সময় দিলেও কার্যকর অগ্রগতি না হলে সেই সময় দেওয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রতিবার কেন প্রতিবেদন জমা দেওয়া গেল না, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসা উচিত।
দ্বিতীয়ত, বারবার তদন্তকারী সংস্থা বদলের প্রভাব। প্রতিবার নতুন সংস্থা এলে নতুন করে নথি বুঝে নিতে ও তদন্ত সাজাতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে। ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পর নতুন করে প্রমাণ সংগ্রহ করা অনেক বেশি কঠিন।
তৃতীয়ত, সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রশ্ন। দেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনায় বিচার না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাগর-রুনি হত্যা এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। এই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া অন্য সাংবাদিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। বিচার না হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও ঝুঁকিতে পড়ে।
চতুর্থত, পরিবারের অপেক্ষা ও ন্যায়বিচারের অধিকার। দুজন মা-বাবাকে হারিয়ে তাঁদের সন্তান বড় হয়েছে, স্বজনেরা দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে বিচারের আশায় অপেক্ষা করছেন। ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচারের অস্বীকৃতি, এই প্রবাদ এই মামলায় নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পঞ্চমত, পিবিআইয়ের সামনে বড় পরীক্ষা। সংস্থাটি এক বছরের বেশি সময় ধরে মামলাটি দেখছে। এই সময়ে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে, নতুন কোনো সূত্র মিলেছে কি না, আদালতে অন্তত তা জানানো দরকার। জনগণের আস্থা ফেরাতে প্রতিবেদন জমার আগেও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে ১৩০তম দফায় তারিখ পেছানো শুধু একটি মামলার আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, এটি দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও আন্তরিকতার প্রশ্নও। আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা পড়ে কি না এবং তাতে কী থাকে, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবেন সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ। এবারও যদি সময়ক্ষেপণই হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।

