রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। আসামিদের একজন কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মো. মিজানুর রহমান। আজ বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
অপর দুই আসামি শাহরিয়ার মাহমুদ (৬০) ও মো. শাহ আলম ওরফে অনিক (৪৭)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্য হওয়ায় মামলাটি রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। তবে প্রতিবেদনে মিজানুরের ভূমিকা বা সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঘটনার কোনো সংযোগের কথা বলা হয়নি, এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ রিমান্ডের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে আসামিদের আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আল আমিন। আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। তবে এজাহারে নাম থাকা পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, অজ্ঞাতনামা আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কারণে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। এখানে লক্ষণীয়, পুলিশের দাবি করা এই প্রাথমিক স্বীকারোক্তি রিমান্ড আবেদনের যুক্তি হিসেবে এসেছে। আদালতে এর আইনগত মূল্য নির্ভর করবে স্বীকারোক্তি কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় নথিভুক্ত হয়, তার ওপর।
রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শওকত হোসেন, মহিউদ্দিনসহ অনেকে রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেক আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অর্থাৎ পুলিশ যে পাঁচ দিন চেয়েছিল, আদালত তার চেয়ে কম সময় দিয়েছেন এবং জামিনের আবেদনও গ্রহণ করেননি। জামিন কেন নামঞ্জুর হলো, সে বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নেই।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ মানিকদীর ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় আনুমানিক ৫০ জন দুষ্কৃতকারী দলবদ্ধ হয়ে বেআইনিভাবে ঢোকে। তারা এলোপাতাড়ি প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে এবং রামদা, ছোরা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। এতে সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. পারভেজসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। অভিযোগে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা নগদ টাকা, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ক্যাবল, ক্যামেরা ও পেশাদার মিডিয়া সরঞ্জামসহ বিপুল মালামাল লুট করে এবং গাড়ি ভাঙচুর করে।
মামলার অভিযোগে বাদী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি এবং ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মালামাল চুরির কথা বলা হয়েছে। দুটি অঙ্ক মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তবে এটি বাদীপক্ষের হিসাব, স্বাধীনভাবে যাচাই করা নয়। একটি আবাসন প্রকল্পে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে এমন বড় আকারের হামলা ও গুলিবর্ষণ আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মতো সংবেদনশীল স্থানের কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটায় এর গুরুত্ব বাড়ে।
ঘটনার সময় আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউন ফিস’ নামের স্টুডিওতেও অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর ও লুটপাট হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে। স্টুডিওটি প্রকল্প এলাকার ভেতরে ছিল কি না এবং হামলার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সালমান মুক্তাদির বা তাঁর স্টুডিওর পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা পুলিশকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন আত্মরক্ষা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়ে। পরে ঘটনাস্থল থেকে এজাহারে নাম থাকা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে অভিযান চালিয়ে আরও একজনকে ধরা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র ও গুলির খোসা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ওপর গুলির অভিযোগ ঘটনাকে আরও গুরুতর করেছে, তবে পুলিশের কেউ আহত হয়েছেন কি না এবং হামলাকারীদের কেউ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কি না, তা জানানো হয়নি। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ‘দেশীয়’ বলা হলেও প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার অভিযোগের সঙ্গে সেগুলোর সংগতি কতটা, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। রিমান্ড আবেদনে ‘অবৈধ অস্ত্র’ উদ্ধারের কথা থাকায় আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস ও ব্যবহারকারী শনাক্ত তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে।
মামলাটি করেছেন প্রকল্পের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া। এতে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনজন। অর্থাৎ নামধারী আসামিদের বড় অংশ এবং অজ্ঞাতনামা শতাধিক ব্যক্তি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এত বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি শনাক্ত করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় বের করাই পুলিশের উদ্দেশ্য বলে আবেদনে স্পষ্ট। ঘটনার পেছনের কারণ, যেমন প্রকল্পের জমি বা মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি না, প্রতিবেদনে সে বিষয়ে কিছু বলা নেই। ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের কথা পুলিশ বললেও রহস্যটি কী, তা প্রকাশ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে মামলাটির কয়েকটি দিক এখন নজরে থাকবে। প্রথমত, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে হামলার কারণ ও পেছনের নির্দেশদাতা সম্পর্কে কী তথ্য মেলে। দ্বিতীয়ত, পলাতক নামধারী আসামিদের গ্রেপ্তার ও অজ্ঞাতনামাদের শনাক্তে পুলিশ কত দ্রুত অগ্রসর হয়। তৃতীয়ত, লুট হওয়া মালামাল ও অস্ত্র উদ্ধার হয় কি না। চতুর্থত, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের তোলা অভিযোগ আদালতে কতটা টেকে। আসামিপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ, যা এখন পর্যন্ত প্রতিবেদনে আইনজীবীদের জামিন আবেদনের বাইরে আসেনি। তিন দিনের রিমান্ড শেষে আসামিদের আবার আদালতে হাজির করা হবে, তখন মামলার পরবর্তী গতিপথ আরও স্পষ্ট হবে।

