অনলাইনে বিবাহ নিবন্ধন চালু হলে তথ্য গোপন করে বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঠেকানো যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, এই নিবন্ধনের তথ্য ধাপে ধাপে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে একজনের বৈবাহিক অবস্থা সহজেই যাচাই করা যাবে। একই অনুষ্ঠানে সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়নে লটারি চালুর ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে দশ দিনব্যাপী একটি আবাসিক প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রশিক্ষণের বিষয় অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের সফটওয়্যার ব্যবহারের নিয়ম এবং এ-সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি।
মন্ত্রী জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের সব কাজীকে এই ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় আনতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, এর সুফল অনেক। বাল্যবিবাহ নিরোধে দেশে আইন রয়েছে এবং সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। কোন এলাকায় বাল্যবিবাহ হচ্ছে কি না, তা আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেখাতে হয়। অনলাইন ব্যবস্থায় সেই তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করা সহজ হবে।
বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করবে, তাও ব্যাখ্যা করেন মন্ত্রী। কেউ তথ্য গোপন করে একাধিক বিয়ে করতে চাইলে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে অনলাইনে অনুসন্ধান করলেই তাঁর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। ওই ব্যক্তি আগে থেকে বিবাহিত হলে তাঁকে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আসতে বলা যাবে। মন্ত্রীর মতে, এভাবে আরও নানা সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রসঙ্গও আসে। আইনমন্ত্রী জানান, ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের দীর্ঘদিনের প্রভাব ভাঙতে শিগগিরই সারা দেশে লটারির মাধ্যমে পদায়ন শুরু হবে।
ঘোষণাটি নীতিগতভাবে ইতিবাচক। এত দিন কাগজভিত্তিক নিবন্ধনে এক কাজীর কাছে করা বিয়ের তথ্য অন্য এলাকার কাজী সহজে জানতে পারতেন না। এই ফাঁক গলে কেউ কেউ তথ্য লুকিয়ে আবার বিয়ে করতে পারতেন। কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থাকলে সেই সুযোগ অনেক কমবে।
তবে কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রথমত, যাঁরা কাজীর কাছে নিবন্ধন না করেই বিয়ে করেন, ব্যবস্থাটি তাঁদের ধরতে পারবে না। বাল্যবিবাহের বড় অংশ গোপনে ও অনিবন্ধিত অবস্থায় হয়, তাই কেবল অনলাইন নিবন্ধনে এর পুরো সমাধান মিলবে না। সামাজিক সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগও সমান জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বয়স যাচাইয়ের ভিত্তি জন্মনিবন্ধন ও পরিচয়পত্র। এসব নথিতে ভুল বয়স থাকলে বা জাল তথ্য দিলে প্রযুক্তি তা ধরতে পারবে না। তাই নথির সঠিকতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। বিয়ে ও তালাকের মতো সংবেদনশীল তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে থাকলে তার সুরক্ষা ও অপব্যবহার রোধে স্পষ্ট নীতিমালা দরকার। সব কাজীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যবস্থার আওতায় আনাও সময়সাপেক্ষ, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট ও ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে।
সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলির সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের একই স্থানে থাকা প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি কতটা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই সুফল নির্ভর করবে। সব মিলিয়ে অনলাইন নিবন্ধন একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু একে সফল করতে চাই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি, তথ্য সুরক্ষা ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি। তবেই বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধে এই উদ্যোগ বাস্তব ফল দেবে।

