ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, যথাযথ জামানত না নেওয়া এবং ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলায় কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুদকের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, ঢাকা-১ কার্যালয়ের করা মামলার তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ধারায় চার্জশিট দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মামলাটি ২০২৩ সালের আগস্টে করা হয়। সে সময় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বাবুল চিশতীসহ ছয়জনকে আসামি করে নতুন মামলা করেছিল দুদক। এখন চার্জশিটের অনুমোদন পাওয়া আসামির সংখ্যা সাত।
আসামিদের মধ্যে আছেন মেসার্স নাসিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া এবং তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের মিরপুর শাখার সাবেক ম্যানেজার (অপারেশন) ইরফানুল হক। আরও আছেন পদ্মা ব্যাংকের সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায় এবং ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক উদ্যোক্তা পরিচালক ও পর্ষদের সাবেক নির্বাহী ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল চিশতী। তালিকায় আরও রয়েছেন মেসার্স বিলিভ ওয়ান অ্যাসোসিয়েটস সার্ভে অ্যান্ড পরিদর্শন কোম্পানির স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মোতালেব পাটওয়ারী এবং পদ্মা ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা প্রধান সাব্বির মোহাম্মদ সায়েম।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে নাসিম এন্টারপ্রাইজের ঋণ আবেদন ঠিকমতো যাচাই-বাছাই না করেই অনুমোদন দেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত নেওয়া হয়নি। অভিযোগ আছে, সামান্য জামানতকে অনেক বেশি মূল্যের দেখানো হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তখন ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছিল। তবু ঋণটি অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। এমনকি জামানতের দলিল সম্পাদনের আগেই টাকা ছাড় করা হয়েছে। সাধারণ ব্যাংকিং রীতিতে জামানত নিশ্চিত না করে ঋণ ছাড় করা হয় না। তাই এ অভিযোগ ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার গুরুতর দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে। দুদক বলছে, এতে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, নাসিম এন্টারপ্রাইজকে ৯৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। সুদসহ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, ঋণগ্রহীতা এই অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি। তিনি টাকা অন্য খাতে সরিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ঋণ আদায়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্তে এসব কর্মকাণ্ডে আসামিদের পারস্পরিক যোগসাজশের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে দুদক। অর্থাৎ অভিযোগটি শুধু একজন গ্রাহকের একক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তা, ঊর্ধ্বতন নির্বাহী, পর্ষদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং জামানতের মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় এসেছে। মামলার প্রকৃত চিত্র আদালতের বিচারেই স্পষ্ট হবে।
এই মামলার আগেও বাবুল চিশতী আরেকটি বড় মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফারমার্স ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় তাঁকে ও তাঁর ছেলে রাশেদুল হক চিশতীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। সেটি আলাদা মামলা। বর্তমান মামলায় চার্জশিটের অনুমোদন মাত্র হয়েছে, বিচার এখনো শুরু হয়নি।
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। চার্জশিটের অনুমোদন মানে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, তা নয়। এটি তদন্তের পর বিচার শুরুর প্রস্তুতির ধাপ। আসামিরা আদালতে নিজেদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে মামলাটি দেখাচ্ছে, ঋণ অনুমোদন ও জামানত যাচাইয়ে শৈথিল্য এবং ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ব্যাংকিং খাতকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলে। চার্জশিট দাখিলের পর বিচার কত দ্রুত এগোয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

