দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ বুধবার দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য, বাদীপক্ষ আপসনামা জমা দিয়ে আসামিদের জামিনে আপত্তি নেই বলে জানালেও আদালত জামিন দেননি।
আদালতে নজরুল ইসলামের পক্ষে জামিন চান আইনজীবী মাহবুবুর রহমান, মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত আবেদন নামঞ্জুর করেন। আদেশের কারণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।
জামিন আবেদনে বলা হয়, নজরুল ইসলাম সম্পূর্ণ নির্দোষ। এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। হয়রানির উদ্দেশ্যে তাঁকে আসামি করা হয়েছে। আবেদনে আরও বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় ডেকে নেওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পরও আত্মহত্যায় প্ররোচনার কোনো প্রমাণ পুলিশ দেখাতে পারেনি। বাদী ও আসামিপক্ষ আগে থেকেই আত্মীয় এবং দুই পরিবার আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসা করেছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, ৭৫ বছর বয়সী নজরুল ইসলাম বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জটিল হৃদরোগে ভুগছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা আছে এবং জামিন পেলে তিনি আত্মগোপন করবেন না বা এলাকা ছেড়ে যাবেন না। গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার আরেক আসামি, নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের জামিন মঞ্জুর হয়েছে। জামিন আবেদনে সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
জামিন আবেদনের সঙ্গে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা একটি আপসনামাও আদালতে জমা দেন। এতে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, মেয়ের মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক সন্দেহ থেকে তিনি নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ও ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। পরে পারিবারিক আলোচনা ও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর মনে হয়েছে, নজরুল ইসলাম বা মাকছুদার প্ররোচনায় মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। আসামিরা জামিন পেলে তাঁর আপত্তি নেই। দুই পরিবারের সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে তিনি আপসনামা করেছেন বলে জানান।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম আক্তারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
পরদিন শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামসুজ্জোহা সরকারের আবেদনে আদালত নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেদিন রাতেই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর মামলায় গ্রেপ্তার ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
এই ঘটনায় আইনি দিক থেকে একটি বিষয় লক্ষণীয়। বাদী নিজে আপসনামা দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি আর আসামিদের দায়ী মনে করছেন না। তবু আদালত জামিন দেননি। আত্মহত্যায় প্ররোচনা আমলযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের মামলায় পক্ষগুলোর মীমাংসা থাকলেও জামিন দেওয়া না দেওয়া নির্ভর করে আদালতের বিবেচনার ওপর। আদেশের যুক্তি জানা না গেলে কেন জামিন নামঞ্জুর হলো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে একই মামলায় মাকছুদা বেগম জামিন পেলেও নজরুল ইসলাম পাননি। এতে বোঝা যায়, আদালত প্রত্যেক আসামির ভূমিকা আলাদাভাবে বিবেচনা করছেন।
মামলায় নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করছেন। রিমান্ডে প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আবেদনে যে দাবি করা হয়েছে, তাও পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগপত্র কবে দেওয়া হবে এবং মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে কী পাওয়া গেছে, সে তথ্যও এখনো প্রকাশ হয়নি।
এখন নজর থাকবে নজরুল ইসলামের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন কি না, সেদিকে। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন কী আসে এবং আপস নামা মামলার গতিপথে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।

