যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। মার্কিন সেনা সদস্য, ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত চলছে। এই তদন্তের জবাবেই এ পদক্ষেপ। রুবিও বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার নাগরিকেরা আইসিসির এখতিয়ারের বাইরে। তাঁর হুঁশিয়ারি, হয় আইসিসি হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র আইসিসিকেই শেষ করে দেবে।
নতুন নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আইসিসির সম্পদ জব্দ করা যাবে। মার্কিন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদও এর আওতায় পড়বে। তবে কিছু ছাড় রাখা হয়েছে। ১৮০ দিনের অতিরিক্ত সময়, কিছু ক্লাউড ও সফটওয়্যার সেবা, আইসিসির পেনশন এবং হেফাজতে থাকা বন্দিদের বিষয়ে আলাদা অনুমতি মিলবে। এই ছাড় থেকে বোঝা যায়, আদালতের দৈনন্দিন কাজ হঠাৎ পুরো থেমে যাক, তা ওয়াশিংটন আপাতত চাইছে না।
আইসিসি এই সিদ্ধান্তকে কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে। আদালত বলেছে, একটি স্বাধীন বিচার প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করা হয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে গড়া এই আদালতকে ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্র গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দিয়েছে। আদালতের ভাষ্য, এটি ন্যায়বিচার আটকে দেওয়ার চেষ্টা। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এই মূল নীতির ওপরই আঘাত এসেছে বলে তারা মনে করে।
ঘোষণাটি এসেছে এমন দিনে, যেদিন নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারে কয়েক দশকের কাজের জন্য তিনি এ সম্মান পান। তিনি জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান। তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের একটি কমিশন ২০২৫ সালে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের দখলদারির সময় এ ঘটনা ঘটেছে বলে কমিশন জানায়।
এই নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ আসেনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাহী আদেশ দেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়েছিল। তার প্রতিক্রিয়াতেই ওই আদেশ আসে। ট্রাম্প মূলত ২০০২ সালের আমেরিকান সার্ভিস মেম্বার্স প্রোটেকশন অ্যাক্টের কিছু ধারার ওপর ভর করেছেন। এই আইন মার্কিন সেনাদের আইসিসির বিচার থেকে সুরক্ষা দিতে চায়।
গত কয়েক মাসে চাপ ধাপে ধাপে বেড়েছে। ১৩ জুলাই রুবিও আইসিসিকে ভেঙে দিতে সরকারের সব বিভাগকে নিয়ে একটি বড় অভিযানের ঘোষণা দেন। তিনি আইসিসির সদস্য দেশগুলোকে সদস্যপদ ছেড়ে দিতে এবং আদালতের তহবিল বন্ধ করতে আহ্বান জানান। মার্কিন কর্মকর্তারা এ–ও ইঙ্গিত দেন, যেসব দেশ মার্কিন সাহায্য নিয়ে আইসিসিকে স্বীকৃতি দেয়, তাদের ওপর নজর বাড়তে পারে। ভিসা বিধিনিষেধ ও কূটনৈতিক চাপের কথাও তিনি বলেন।
এরপর ১৮ আগস্ট নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত হন আইসিসির প্রেসিডেন্ট, জাপানের বিচারক তোমোকো আকানে। সঙ্গে ছিলেন সেনেগালের আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ে, যিনি আদালতের সিনিয়র ট্রায়াল আইনজীবী। রয়টার্সের বরাতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এর আগেই অন্তত ১১ জন আইসিসি কর্মকর্তা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে নয়জন বিচারক এবং প্রধান প্রসিকিউটর আছেন। এই নিষেধাজ্ঞায় সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং কিছু মার্কিন সেবা পাওয়ায় বাধা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলছে। রুবিওর বক্তব্য, আইসিসি এখতিয়ারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং যেসব দেশ রোম সনদে সই করেনি, তাদের নাগরিকদের ওপরও কর্তৃত্ব দেখাতে চাইছে। নেতানিয়াহুও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি আদালতের পদক্ষেপকে ইহুদিবিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে আইসিসি বলছে, তারা রোম সনদ মেনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই অভিযানে উদ্বিগ্ন। জুলাইয়ে ইস্তাম্বুলে এক আইন সম্মেলনে আইনজ্ঞরা আইসিসিকে রক্ষায় একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করেন। তাঁদের মতে, দায়মুক্তি বাড়লে আন্তর্জাতিক আইনই দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ১৬ জুলাই মানবাধিকার সংগঠন ডন (DAWN) একটি মামলা করে। তাদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা ফিলিস্তিন বিষয়ে মানবাধিকার কাজ করা মার্কিন নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারে হাত দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মামলায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুরো আদালতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আইসিসির সঙ্গে প্রমাণ ভাগ করে নেওয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলা তদন্তও পড়তে পারে। অর্থাৎ যেসব মামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পর্ক নেই, সেগুলোর কাজও ধীর হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই খবর গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য দেশ। রোহিঙ্গা সংকটে আইসিসির তদন্তের আইনি ভিত্তিও বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমার রোম সনদের সদস্য নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। এই যুক্তিতেই ২০১৮ সালে আদালত এখতিয়ার আছে বলে রায় দেয়। নতুন নিষেধাজ্ঞা এই মামলাকে সরাসরি কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আদালত দুর্বল হলে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের আশাও ক্ষীণ হতে পারে।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র করল। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সাহায্য করেছিল। এ বছরের জানুয়ারিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বকে বিশ্বব্যবস্থার বড় ভাঙন বলে বর্ণনা করেছিলেন। আইসিসির ওপর এই পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সেই ভাঙনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠছে।

