রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্ত শেষ হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া একাধিক আলামতে গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ মিলেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পরদিন ২৩ আগস্ট গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ পরে গণপতির প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। মামলাটি প্রথমে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব যায় রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে।
ডিএনএ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, খেজুরের বিচির নমুনায় মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পাওয়া গেছে। শসার টুকরায় পাওয়া গেছে সিদ্ধার্থ দাসের ডিএনএ। বিড়ির শেষাংশে দুজনেরই ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। নিহত প্রীতিলতার গলায় প্যাঁচানো গামছায় পাওয়া গেছে শুধু মুগ্ধ দাসের ডিএনএ। ঘটনাস্থলের এই আলামতগুলো মামলার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা মোট ৩১ ধরনের নমুনা ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। নমুনা পাঠানো হয় গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে ছিল খেজুরের বিচি, শসার অংশ, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, বেসিনের দাগ এবং দুই আসামির রক্তের নমুনা। গত বৃহস্পতিবার সিআইডি কার্যালয় থেকে পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী রোববার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, ডিএনএ প্রতিবেদন, উদ্ধার করা আলামত, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব মিলিয়ে চার হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাস্থলে নিহত চারজন ও এই দুই আসামি ছাড়া অন্য কারও ডিএনএ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার আলামত তদন্তে মেলেনি।
হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়েও তদন্তের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন জিন্নাত আলী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীকে দুজন মিলে হত্যা করেন। প্রীতিলতাকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস। মেয়ে আগামীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস। ছোট ছেলে আয়ুশকে হত্যা করেন দুজন একসঙ্গে। এই বিশ্লেষণে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া চারজন এবং পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ৫৬ জনের বক্তব্যও কাজে লাগানো হয়েছে। আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন এলাকার শান্ত দাস, সীমান্ত দাস, দুলাল শর্মা এবং কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস।
হত্যার কারণ নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আসামিরা খবর পেয়েছিলেন যে গণপতি অবসরের পর পাওয়া ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাড়িতে রেখেছেন। বাড়িতে অনেক স্বর্ণালংকার আছে বলেও তাঁদের ধারণা ছিল। এই টাকা ও গয়না চুরির উদ্দেশ্যেই তাঁরা বাড়ির ছাদ দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এরপর একে একে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন। তদন্তের এই অবস্থান ঘটনার শুরুতে পুলিশের দেওয়া ভিন্ন একটি বক্তব্যের চেয়ে আলাদা। সে সময় ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে হত্যার কথা বলা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে আলাদা করে কিছু বলা হয়নি।
ঘটনার পর আরেকটি প্রশ্ন বারবার উঠছিল। মা প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হতে দুজনের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এতে এ-সংক্রান্ত গুজব ও জল্পনার অবসান হলো।
ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন জিন্নাত আলী। এখন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যেই দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। অভিযোগপত্র গৃহীত হলে বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর পথ খুলবে।
একই পরিবারের চারজন, তার মধ্যে দুই শিশু-কিশোর, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোটা এলাকায় গভীর আতঙ্ক ও শোক তৈরি করেছিল। এখন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্বীকারোক্তি ও সাক্ষীদের বক্তব্য একই দিকে ইঙ্গিত করায় মামলাটি শক্ত ভিত্তি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা না হওয়ার সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ারেই থাকবে। স্বজনেরা এখন দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের অপেক্ষায়।

