ঢাকার সাভারে বায়ুদূষণের কারণে ইটভাটার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও ইট উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তিনটি পৃথক মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলায় তিনজন ব্যক্তি ও চারটি প্রতিষ্ঠানকে আসামি করা হয়েছে। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব ইটভাটায় উৎপাদিত ইটের বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। মামলাগুলো সাভার থানায় করা হয়েছে।
আজ সোমবার সিআইডির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ।
মামলার আসামিরা হলেন মো. জাকির হোসেন, মো. আবু বকর ও কাওছার আহমেদ। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, জাকির হোসেন মেসার্স এ বি এন অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। আবু বকর মেসার্স এম এইচ এস স্টার ও মেসার্স এম এইচ বি স্টার কোংয়ের স্বত্বাধিকারী। কাওছার আহমেদ মেসার্স এ আই এম ব্রিকস কোংয়ের স্বত্বাধিকারী। মোট চারটি ইটভাটার কার্যক্রম নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ হলো, পরিবেশগত অপরাধের মাধ্যমে অর্থ আয় করা এবং সেই অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে প্রকৃত উৎস গোপন করা।
নিষেধাজ্ঞার পটভূমিও বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। সিআইডি পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণের বরাতে জানায়, সাভার এলাকায় বায়ুর বার্ষিক দূষণমাত্রা নির্ধারিত মানের প্রায় তিন গুণ ছাড়িয়ে গেছে। এতে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সাভারের দূষণ ঢাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে, ফলে রাজধানীর বায়ুমানও খারাপ হয়।
এ পরিস্থিতিতে বায়ুদূষণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ অর্থাৎ মারাত্মক বায়ুদূষণপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাভারের সব ইটভাটায় ইট পোড়ানোসহ ইট তৈরির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
সিআইডির দাবি, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ইটভাটাগুলোয় অবৈধভাবে ইট উৎপাদন চলেছে। এসব ইট বিক্রির অর্থ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়েই মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ সামনে আসে। সংস্থাটির ভাষ্য, পরিবেশগত অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে উৎস গোপন করা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) অনুযায়ী অপরাধ। অনুসন্ধানে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধানও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা প্রাথমিক হিসাবে উৎপাদিত ইটের বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে মনে হয়েছে, এই অর্থ পরিবেশগত অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার। তিন কোটি টাকা ইটের বাজারমূল্য। পুরো অঙ্কটি মানিলন্ডারিংয়ের অর্থ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নেই। মামলার তদন্তে অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হবে।
সিআইডি জানিয়েছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করা অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনাই এই অনুসন্ধানের লক্ষ্য। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলা অন্য ইটভাটার বিরুদ্ধেও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনাটি আলাদা তাৎপর্য বহন করে। সাধারণত ইটভাটার অবৈধ কার্যক্রমে পরিবেশ আইনে জরিমানা বা অভিযান চালানো হয়। এবার সেই অপরাধের আয়কে মানিলন্ডারিংয়ের আওতায় আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তুলনামূলক কঠোর হতে পারে। তবে অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। মামলার তদন্ত ও আদালতের বিচারের মধ্য দিয়েই তা নির্ধারিত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ নেই।
সাভারের বাতাসের মান ফেরাতে নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। নিষেধাজ্ঞা জারির এক বছরের বেশি সময় পরও ইটভাটা চালু থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাই কেবল মামলা নয়, নিয়মিত তদারকি ও অভিযান জোরদার করা জরুরি।

