ধর্মীয় বিধানের ব্যাখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিচারের নামে যেন অবিচার না হয়
মানুষের জীবন কি এতটাই মূল্যহীন যে একটি অভিযোগ, একটি স্বীকারোক্তি কিংবা কয়েকটি অস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তার জীবন কেড়ে নেওয়া যায়? অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া অবশ্যই ন্যায়বিচারের অংশ। কিন্তু সেই শাস্তি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যদি নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গভীর।
ইসলামি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই শুধু কোন অপরাধে কী শাস্তি রয়েছে, সেটি জানলেই চলে না; একই সঙ্গে বুঝতে হবে অপরাধ প্রমাণের শর্ত কী, বিচারকের দায়িত্ব কতটা, অভিযুক্তের অধিকার কোথায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী।
ইসলামের বিচারদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা। পবিত্র কোরআনে একটি নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার এবং ন্যায়সংগত শাস্তির বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ ‘অপরাধের বিচার ও মানুষের জীবনের সুরক্ষা’ দুটিই ইসলামি ন্যায়বিচারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তব সমস্যা দেখা দেয় যখন ধর্মীয় বিধানের আংশিক ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রমাণের মান এবং অভিযুক্তের অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়।
শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু বিচার কি নিশ্চিত?
ইসলামি ফিকহে হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস, নির্দিষ্ট শর্তে বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচারের জন্য প্রচলিত ধ্রুপদি বিধান এবং হিরাবাহ বা সশস্ত্র সন্ত্রাস ও জননিরাপত্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের শাস্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিধান এক ধরনের নয়; প্রতিটির প্রকৃতি, প্রমাণের শর্ত, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং ফিকহি ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকা আর কাউকে সেই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা এক বিষয় নয়। অভিযোগ, সন্দেহ এবং প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য অগ্রাহ্য করে কাউকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচার হতে পারে না।
বিশেষ করে ব্যভিচারের অভিযোগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মিথ্যা অপবাদ, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও সামাজিক অপমানের ঝুঁকি রয়েছে। ধ্রুপদি ইসলামি ফিকহে নির্দিষ্ট হদ্দ শাস্তির ক্ষেত্রে কঠোর প্রমাণের শর্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিধানের আলোচনা করতে গিয়ে শুধু শাস্তির কথা বললে হবে না; অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং মানুষের সম্মান রক্ষার নীতিও সামনে আনতে হবে।
| কারণ, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; নিরপরাধ মানুষকে অন্যায় শাস্তি থেকে রক্ষা করাও। যে বিচারব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিরপরাধের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তার ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। |
মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ভুল হলে দায় নেবে কে?
কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে ভুল বিচারের প্রতিকার পাওয়ার কিছু সুযোগ থাকে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে সেই ভুল সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। নিরপরাধ একজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর রাষ্ট্র কিংবা আদালত যত বড় ক্ষতিপূরণই দিক না কেন, তার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না।
এ কারণেই মৃত্যুদণ্ডের মামলায় প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ইসলামি বিচারচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সন্দেহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাস্তি প্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা। তবে বিভিন্ন অপরাধের শ্রেণি ও ফিকহি মতভেদ অনুযায়ী এই নীতির প্রয়োগের ব্যাখ্যা এক নয়। তাই একে সব অপরাধে অভিন্ন আইনি সূত্র হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট বিধান ও বিচারিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আধুনিক বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোও অস্বীকার করা যায় না। অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন, তিনি আইনজীবীর সহায়তা পাবেন, অভিযোগ ও প্রমাণ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবেন এবং বিচার হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে, এসবই ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।
কেবল ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা জনতার দাবির ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। অপরাধের বিচার করতে হবে প্রমাণ ও আইন অনুসারে, আবেগ কিংবা প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়।
ধর্মের নামে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সুযোগ নেই
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় বিধানের নামে কেউ কি নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন? উত্তরটি স্পষ্ট হওয়া দরকার কেননা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে হত্যা করা, নির্যাতন করা কিংবা শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গ্রহণযোগ্য পথ নয়।
কিসাসের মতো বিধানে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের অধিকার স্বীকৃত হলেও এর অর্থ এই নয় যে যে কেউ নিজের সিদ্ধান্তে কাউকে হত্যা করতে পারবেন। বিচারিক কর্তৃপক্ষ, প্রমাণ যাচাই, আইনি অধিকার এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া এ সবকিছুর গুরুত্ব রয়েছে। একইভাবে হিরাবাহ বা সশস্ত্র অপরাধের বিধানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুকে দমন করার হাতিয়ার বানানোরও কোনো ন্যায়সংগত ভিত্তি নেই।
ধর্মীয় বিধানের অপব্যবহার তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন কেউ নিজের ব্যাখ্যাকেই চূড়ান্ত সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং অন্যের জীবন ও মর্যাদার ওপর নিজের কর্তৃত্ব দাবি করেন।
ধর্ম মানুষের নৈতিকতা ও ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করার কথা। অথচ ধর্মের নামেই যদি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়, নির্যাতন করা হয় কিংবা হত্যার বৈধতা দাবি করা হয়, তাহলে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সেই আচরণের সংঘাত তৈরি হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আইন ও বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব
বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় ও বহুমতের সমাজে ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় কোনো শাস্তি প্রয়োগের প্রশ্ন এলে সংবিধান, প্রচলিত আইন, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি কেবল আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত ও কার্যকর হতে পারে। কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক ফতোয়া কিংবা জনতার দাবি আদালতের বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে অভিযুক্তের ধর্ম, পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদা যেন বিচারের ফল নির্ধারণ না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক একই আইনের অধীন থাকেন, সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা পান, অভিযুক্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান এবং আদালত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অপরাধীকে দায়মুক্তি দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধ প্রমাণের আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়াও অন্যায়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এই দুই বিপদের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে।
কঠোর শাস্তি নয়, ন্যায়বিচারই হোক মূল লক্ষ্য
একটি সভ্য সমাজের সাফল্য শুধু কত কঠোর শাস্তি দেওয়া হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, বিচারব্যবস্থা কতটা নিরপেক্ষ, ভুক্তভোগী কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং নিরপরাধ মানুষ কতটা নিরাপদ এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেও আবেগের পরিবর্তে যুক্তি, মানবিকতা, আইনি বাস্তবতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া দরকার। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে আইন ও নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। তাই ধর্মীয় বিধান ব্যাখ্যা করার সময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ফিকহি মতভেদ এবং সমকালীন আইনি কাঠামোর পার্থক্যও স্পষ্ট করা জরুরি।
ইসলামি ন্যায়বিচারের আলোচনা যদি সত্যিই মানুষের জীবন ও অধিকার রক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে তার কেন্দ্রে থাকতে হবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, ন্যায্য বিচার, অন্যায় প্রতিরোধ এবং বিচারিক দায়বদ্ধতা। শাস্তির কঠোরতা নিয়ে আলোচনা যতটা জরুরি, শাস্তির অপব্যবহার রোধের প্রশ্নটিও ততটাই জরুরি।
কারণ, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; নিরপরাধ মানুষকে অন্যায় শাস্তি থেকে রক্ষা করাও। যে বিচারব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিরপরাধের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তার ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

